বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
জীবনযাপন

বিচ্ছেদের পরও মন কেন আটকে থাকে অতীতে?

bicched

“এতদিন হয়ে গেল, এখনও ভুলতে পারোনি?”- বিচ্ছেদের পর এমন প্রশ্ন অনেককেই শুনতে হয়। চারপাশের মানুষ যখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে বলে মনে হয়, তখন নিজের দীর্ঘস্থায়ী কষ্ট অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলছে, বাস্তবতা ভিন্ন। সম্পর্কের সমাপ্তির পর মানসিক ব্যথা অনুভব করা মানুষের স্বাভাবিক আবেগীয় প্রতিক্রিয়া, আর সেই ব্যথা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রত্যেকের সময়ও আলাদা।

সম্পর্ক শুধু দুজন মানুষের একসঙ্গে থাকা নয়; এটি বিশ্বাস, অভ্যাস, নিরাপত্তা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন এবং আবেগের এক জটিল বন্ধন। সেই বন্ধন ভেঙে গেলে মানুষ শুধু একজন সঙ্গীকেই হারায় না, হারায় নিজের জীবনের একটি পরিচিত অধ্যায়ও। তাই ব্রেকআপের পর শূন্যতা, দুঃখ, রাগ, অপরাধবোধ কিংবা একাকিত্ব- এসব অনুভূতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ভালোবাসার সম্পর্কে থাকাকালে মস্তিষ্কে ডোপামিন, অক্সিটোসিন ও সেরোটোনিনের মতো রাসায়নিক পদার্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলে সেই পরিচিত আবেগীয় সংযোগ হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় মানসিক চাপ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা শোকের বিভিন্ন ধাপ- অস্বীকার, রাগ, দর-কষাকষি, বিষণ্নতা এবং গ্রহণ- এর মধ্য দিয়েও যেতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) দীর্ঘদিন ধরেই মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব তুলে ধরে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে তীব্র দুঃখ, ঘুমের সমস্যা, ক্ষুধামন্দা, দৈনন্দিন কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা বা নিজের ক্ষতি করার চিন্তা দেখা দিলে তা শুধু ব্রেকআপের স্বাভাবিক কষ্ট নাও হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

Advertisements

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও বিচ্ছেদের কষ্টকে অনেক সময় বাড়িয়ে দেয়। সাবেক সঙ্গীর নতুন ছবি, নতুন সম্পর্ক বা সুখী মুহূর্তের পোস্ট দেখে অনেকেই মনে করেন, “সে তো ভালো আছে, শুধু আমিই কষ্ট পাচ্ছি।” কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, সামাজিক মাধ্যমে মানুষের জীবনের নির্বাচিত অংশই দেখা যায়; বাস্তব জীবনের পুরো চিত্র নয়।

নিরাময়ের প্রক্রিয়ায় নিজেকে সময় দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাবার, শরীরচর্চা, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, নতুন কোনো শখ গড়ে তোলা কিংবা ডায়েরি লেখার মতো অভ্যাস মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নেওয়াও দুর্বলতার নয়, বরং নিজের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার পরিচয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা না করা। কেউ হয়তো কয়েক সপ্তাহে স্বাভাবিক হয়ে ওঠেন, আবার কারও কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় লাগে। নিরাময় কোনো দৌড় নয়, যেখানে আগে পৌঁছানোই সাফল্য। বরং নিজের অনুভূতিকে সম্মান জানিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়াই প্রকৃত সুস্থতার পথ।

একটি সম্পর্কের সমাপ্তি জীবনের শেষ অধ্যায় নয়। সময়, আত্ম-সহানুভূতি এবং প্রয়োজনীয় সমর্থন মানুষকে নতুন করে শুরু করার সাহস দেয়। তাই যদি এখনও কষ্ট থেকে যায়, নিজেকে দোষারোপ করবেন না। আপনার অনুভূতি বাস্তব, আপনার ব্যথা গুরুত্বপূর্ণ, আর আপনার নিরাময়ের পথও একান্তই আপনার নিজের।

Advertisements
অতীতবিচ্ছেদমনোবিজ্ঞানীসম্পর্ক