বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
নারী

হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অটিজম: নারীদের ‘মাস্কিং’-এর অদৃশ্য লড়াই

360_F_521930182_d09oUtmqnsL2ory0PP7yxkzAhQeo0gfp

কর্মক্ষেত্রে তিনি দক্ষ, বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণখোলা আড্ডা দেন, পারিবারিক অনুষ্ঠানেও সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে যান। বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে, সবকিছুই ঠিকঠাক। কিন্তু দিনের শেষে তিনি ক্লান্ত, মানসিকভাবে অবসন্ন। কারণ সারাদিন ধরে তিনি এমন এক অভিনয় করে গেছেন, যা অন্যদের চোখে ধরা পড়ে না। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রচেষ্টার নাম মাস্কিং (Masking)।

মাস্কিং বলতে বোঝায়, একজন অটিস্টিক ব্যক্তি নিজের স্বাভাবিক আচরণ, যোগাযোগের ধরন বা সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়াগুলো আড়াল করে সমাজের প্রচলিত প্রত্যাশার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা। অনেকের ক্ষেত্রে এটি সচেতনভাবে ঘটে, আবার অনেকের কাছে এটি দীর্ঘদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়।

কেন নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি আলোচিত?

গবেষকেরা মনে করেন, অটিজমের প্রাথমিক ধারণা ও নির্ণয়-পদ্ধতি দীর্ঘদিন মূলত ছেলেদের লক্ষণকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। ফলে অনেক মেয়ের অটিজমের প্রকাশভঙ্গি সেই প্রচলিত ধারণার সঙ্গে না মেলায় তারা নির্ণয়ের বাইরে থেকে যান।
অনেক অটিস্টিক নারী ছোটবেলা থেকেই অন্যদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে সামাজিক নিয়ম শেখার চেষ্টা করেন। কেউ কথোপকথনের ধরন অনুকরণ করেন, কেউ চোখে চোখ রেখে কথা বলার অনুশীলন করেন, আবার কেউ নিজের অস্বস্তি বা সংবেদনগত চাপ চেপে রাখেন। বাইরে থেকে এগুলো স্বাভাবিক মনে হলেও, এর জন্য তাদের প্রচুর মানসিক শক্তি ব্যয় করতে হয়।

Advertisements

মাস্কিং কেমন হতে পারে?

-জোর করে চোখে চোখ রেখে কথা বলা।
-আগে থেকে কথোপকথনের উত্তর অনুশীলন করা।
-নিজের স্বাভাবিক নড়াচড়া বা আত্ম-নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ (স্টিমিং) লুকিয়ে রাখা।
-অতিরিক্ত হাসিমুখে বা সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করা, যদিও ভেতরে ক্লান্তি কাজ করছে।
-সামাজিক পরিস্থিতিতে অন্যদের আচরণ অনুকরণ করা।

দীর্ঘদিন মাস্কিংয়ের প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে মাস্কিং করলে অনেকের মধ্যে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আত্মপরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি এবং অটিস্টিক বার্নআউট দেখা দিতে পারে। অনেকেই জানান, সারাদিন সামাজিকভাবে নিজেকে ধরে রাখার পর বাসায় ফিরে তারা সম্পূর্ণ অবসন্ন অনুভব করেন।

কেন দেরিতে নির্ণয় হয়?

নারীদের অটিজম অনেক সময় প্রচলিত ধারণার সঙ্গে মেলে না। ফলে তাদের উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা অন্য মানসিক সমস্যার চিকিৎসা হলেও অটিজমের বিষয়টি দীর্ঘদিন অজানাই থেকে যেতে পারে। অনেক নারী প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে, কখনো নিজের সন্তানের অটিজম নির্ণয়ের পর, প্রথমবার বুঝতে পারেন যে তাদের নিজের মধ্যেও একই বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি- সব অটিস্টিক নারী মাস্কিং করেন না, আবার মাস্কিং শুধু অটিস্টিক ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাই কোনো একটি আচরণ দেখে অটিজম সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। নির্ণয় সবসময় প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে হওয়া উচিত।

মাস্কিং সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লে শুধু অটিজম শনাক্ত করাই সহজ হবে না, বরং অটিস্টিক মানুষদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও আরও সহানুভূতিশীল হবে। অনেক সময় তারা সাহায্য চান না, কারণ বছরের পর বছর তারা শিখে গেছেন- নিজের অস্বস্তি লুকিয়ে রাখাই যেন স্বাভাবিক। অটিজমকে “লুকিয়ে রাখা” নয়, বরং তাকে বুঝতে শেখাই হতে পারে একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার প্রথম পদক্ষেপ।

Advertisements
অটিজমনারীমাস্কিং