নারী হয়ে পুরুষের ছদ্মবেশে যুদ্ধজয়, ইতিহাসে অমর ডেবোরা স্যাম্পসন

ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা প্রচলিত নিয়মকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নিজেদের জন্য নতুন পথ তৈরি করেছেন। আঠারো শতকের আমেরিকায় যখন নারীদের যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানোর অধিকারই ছিল না, তখন এক তরুণী নিজের পরিচয় গোপন করে পুরুষের ছদ্মবেশে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। শুধু যোগই দেননি, সম্মুখযুদ্ধে লড়েছেন, আহত হয়েছেন, শত্রু বন্দি করেছেন এবং দীর্ঘদিন নিজের পরিচয় গোপন রেখেছেন। তিনি ডেবোরা স্যাম্পসন—আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য সাহসিকতার নাম।
সমাজের নিষেধাজ্ঞা ভেঙে যুদ্ধের পথে
আঠারো শতকের আমেরিকায় নারীদের জন্য যুদ্ধক্ষেত্র ছিল নিষিদ্ধ। তারা সৈনিক হতে পারতেন না; সর্বোচ্চ সেবিকা বা রাঁধুনি হিসেবে সেনাশিবিরে কাজ করার সুযোগ ছিল। কিন্তু ডেবোরা স্যাম্পসন বিশ্বাস করতেন, দেশ রক্ষার দায়িত্ব নারী-পুরুষ উভয়েরই।
এই বিশ্বাস থেকেই তিনি প্রথমবার পুরুষের ছদ্মবেশে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। বিষয়টি প্রকাশ হয়ে গেলে স্থানীয় ব্যাপ্টিস্ট চার্চ তাকে সমাজচ্যুত করার ঘোষণা দেয়। কিন্তু সেই অপমানও তাকে থামাতে পারেনি।
দারিদ্র্যের ভেতর বেড়ে ওঠা এক সাহসী কন্যা
১৭৬০ সালের ১৭ ডিসেম্বর ম্যাসাচুসেটসের প্লিম্পটনে জন্ম নেন ডেবোরা। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সাহসী ও চঞ্চল স্বভাবের। ছোটবেলাতেই তার জীবনে নেমে আসে কঠিন বিপর্যয়। বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যান এবং অর্থকষ্টে তার মা সন্তানদের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় দিতে বাধ্য হন। ডেবোরার শৈশব কেটেছে বিভিন্ন পরিবারের কাছে। একসময় তিনি সাবেক ধর্মযাজক পরিবারের আশ্রয়ে পড়াশোনার সুযোগ পান। পরে কৃষক জেরেমিয়াহ থমাসের পরিবারে থাকাকালে দেশপ্রেমের শিক্ষা লাভ করেন। যদিও সে পরিবার নারীশিক্ষার পক্ষে ছিল না, তবুও ডেবোরা গোপনে বই ধার করে নিজেই পড়াশোনা চালিয়ে যান। গৃহপরিচারিকার কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি শিক্ষকতা, তাঁতের কাজ এবং হাতে তৈরি সামগ্রী বিক্রি করে নিজের জীবিকা নির্বাহ করতেন।

‘রবার্ট শ্রুটলিফ’ নামে নতুন পরিচয়
১৭৮২ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে। ঠিক তখনই ডেবোরা সিদ্ধান্ত নেন, তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবেন। প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি বোস্টনের কাছে গিয়ে নিজের নতুন পরিচয় দেন—রবার্ট শ্রুটলিফ। এই পরিচয়ে ম্যাসাচুসেটসের চতুর্থ পদাতিক বাহিনীতে প্রাইভেট সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। তার উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি এবং শারীরিক গঠন অনেকটাই পুরুষদের মতো হওয়ায় সহযোদ্ধাদের কেউই তার আসল পরিচয় বুঝতে পারেনি।
যুদ্ধক্ষেত্রে অসাধারণ সাহস
সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর ডেবোরা একাধিক সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। এক অভিযানে তার দল ১৫ জন ব্রিটিশ সৈন্যকে বন্দি করতে সক্ষম হয়। ১৭৮২ সালের ৩ জুলাই টেরিটাউনের কাছে এক ভয়াবহ যুদ্ধে তার কপালে তলোয়ারের আঘাত লাগে এবং উরুতে দুটি মাস্কেটের গুলি বিদ্ধ হয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি হাসপাতালে যেতে অস্বীকৃতি জানান। শেষ পর্যন্ত সহযোদ্ধারা জোর করে তাকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে গেলে কপালের ক্ষতের চিকিৎসা হয়, কিন্তু উরুর গুলি বের করার আগেই তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান। পরে নিজেই ছোট ছুরি দিয়ে একটি গুলি বের করেন। আরেকটি গুলি এত গভীরে ছিল যে সেটি সারা জীবন তার শরীরেই থেকে যায়। এই আঘাতের কারণে পরবর্তী সময়ে তিনি প্রায় পঙ্গুত্বের মতো কষ্ট ভোগ করেন।
যেভাবে প্রকাশ পেল আসল পরিচয়
শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে পরে জেনারেল জন প্যাটারসনের অধীনে অন্য দায়িত্বে রাখা হয়। ১৭৮৩ সালে ফিলাডেলফিয়ায় অবস্থানকালে ডেবোরা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। তখন চিকিৎসক বারনাবাস বিনি তার আসল পরিচয় জানতে পারেন। তবে তিনি বিষয়টি গোপন রাখেন। বরং নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে স্ত্রী ও মেয়ের সহযোগিতায় ডেবোরার সেবা করেন। সুস্থ হওয়ার পর তাকে একটি চিঠি দিয়ে জেনারেল প্যাটারসনের কাছে পাঠান। চিঠি হাতে নিয়ে ডেবোরা ভেবেছিলেন, এবার হয়তো তার সবকিছু শেষ। পরে তিনি লিখেছিলেন, পুনরায় দলে ফিরে গিয়ে সেই চিঠি কমান্ডারের হাতে তুলে দেওয়া তার কাছে কামানের গোলার মুখোমুখি হওয়ার চেয়েও কঠিন মনে হয়েছিল। কিন্তু ফল হলো সম্পূর্ণ উল্টো। জেনারেল প্যাটারসন তার সাহস, সততা এবং শৃঙ্খলায় এতটাই মুগ্ধ হন যে কোনো শাস্তি না দিয়ে ১৭৮৩ সালের ২৫ অক্টোবর সম্মানের সঙ্গে তাকে সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি দেন।
যুদ্ধশেষেও থামেননি
যুদ্ধ শেষে ডেবোরা বেঞ্জামিন গ্যানেটকে বিয়ে করেন। তাদের তিন সন্তান জন্ম নেয় এবং পরে একটি কন্যাশিশুকে দত্তক নেন ।সংসারের অভাব কখনোই দূর হয়নি। কৃষিকাজ করেও পরিবারকে স্বচ্ছল করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় যুদ্ধের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেনশনের জন্য তিনি আবেদন করেন। কিন্তু শুধু আবেদন করেই তিনি থেমে থাকেননি। নিজের যুদ্ধজীবনের অভিজ্ঞতা মানুষের সামনে তুলে ধরতে আত্মজীবনী লেখার উদ্যোগ নেন। স্থানীয় লেখক হারম্যান ম্যান তার জীবনী লিখতে সহায়তা করেন। ১৮০২ সালে তিনি বিভিন্ন শহরে ঘুরে বক্তৃতা দেওয়া শুরু করেন। কখনো নারীর পোশাকে মঞ্চে উঠতেন, আবার কিছুক্ষণ পর যুদ্ধের পোশাকে ফিরে এসে সামরিক কসরত দেখিয়ে শ্রোতাদের বিস্মিত করতেন। এই অভিনব উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের পাশাপাশি যুদ্ধের অনেক জাতীয় বীরের সমর্থনও অর্জন করেন।
শেষ পর্যন্ত মিলে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
জনসমর্থনের কারণে কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত ডেবোরা স্যাম্পসনের যুদ্ধকালীন অবদান স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তাকে পেনশন ও আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়। তবে সেই অর্থ তার দারিদ্র্য দূর করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। যুদ্ধের ক্ষত তাকে সারাজীবন শারীরিক যন্ত্রণা দিয়েছে। ঋণের বোঝাও কমেনি। ১৮২৭ সালে ৬৬ বছর বয়সে পীতজ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। পরিবারের আর্থিক সংকট এতটাই ছিল যে মৃত্যুর পর তার কবরেও কোনো হেডস্টোন বসানো সম্ভব হয়নি। বহু বছর পর উদ্যোগ নিয়ে তার সমাধি চিহ্নিত করা হয় এবং যথাযোগ্য সম্মান দেওয়া হয়। ডেবোরার মৃত্যুর পর তার স্বামী সরকারি আর্থিক সহায়তার আবেদন করেছিলেন। প্রথমে আবেদনটি নাকচ হলেও পরে কংগ্রেস ডেবোরার অবদানকে নজিরবিহীন হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং তার পরিবারকে সহায়তার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেই অর্থ পাওয়ার আগেই তার স্বামীও মৃত্যুবরণ করেন।

ইতিহাসে ডেবোরা স্যাম্পসনের স্থান
ডেবোরা স্যাম্পসনের গল্প কেবল একজন নারী সৈনিকের কাহিনি নয়; এটি সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং সামাজিক বাধা অতিক্রম করার এক অনন্য উদাহরণ। এমন এক সময়ে, যখন নারীদের যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়ানোর অধিকার ছিল না, তিনি নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছিলেন অস্ত্র হাতে।
আজও ইতিহাস তাকে শুধু পুরুষের ছদ্মবেশ নেওয়া এক নারী হিসেবে নয়, বরং একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক ও বীর যোদ্ধা হিসেবে স্মরণ করে।



