হঠাৎ ভয়, বুক ধড়ফড়, শ্বাসকষ্ট- কখন বুঝবেন এটি প্যানিক অ্যাটাক?

হঠাৎ বুক ধড়ফড়, মনে হচ্ছে এখনই মারা যাবেন? হতে পারে প্যানিক অ্যাটাক! আপনি হয়তো অফিসের কাজ করছেন, বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছেন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে মগ্ন। হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই বুক জোরে ধড়ফড় করতে শুরু করল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, হাত-পা কাঁপছে, মাথা ঘুরছে। মনে হচ্ছে, এই বুঝি হার্ট অ্যাটাক হলো কিংবা মৃত্যু খুব কাছেই।
এমন ভয়ংকর অভিজ্ঞতাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় প্যানিক অ্যাটাক। এটি হার্ট অ্যাটাক নয়, বরং তীব্র মানসিক উদ্বেগের হঠাৎ বিস্ফোরণ। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের তথ্য অনুযায়ী, প্যানিক অ্যাটাক শরীরের স্বাভাবিক ‘ফ্লাইট-অর-ফাইট’ প্রতিক্রিয়ার আকস্মিক প্রকাশ। অর্থাৎ, মস্তিষ্ক যখন কোনো পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক বলে মনে করে, তখন শরীর নিজেকে রক্ষার জন্য দ্রুত প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা সক্রিয় হয়ে সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমকে উদ্দীপিত করে। এর ফলে অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসলসহ বিভিন্ন স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাস দ্রুত হয় এবং শরীর লড়াই বা পালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে।

একসময় এই প্রতিক্রিয়া মানুষকে বন্য প্রাণী বা শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু আধুনিক জীবনে বাস্তব বিপদের পরিবর্তে চাকরির চাপ, পরীক্ষার দুশ্চিন্তা, পারিবারিক অশান্তি কিংবা দীর্ঘদিনের উদ্বেগও একই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
কেন হয় প্যানিক অ্যাটাক?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, বংশগত কারণ, মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যের পরিবর্তন এবং অতীতের কোনো মানসিক আঘাত প্যানিক অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যারা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভুগছেন, তাদের মধ্যে এই সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
শুরু হলে কী করবেন?
প্যানিক অ্যাটাকের সময় মনে হতে পারে, নিজের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন। তবে মনে রাখতে হবে, এটি সাধারণত ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই কমে আসে।
এ সময় ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করুন। চার সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিন, চার সেকেন্ড ধরে রাখুন, এরপর চার সেকেন্ড ধরে ধীরে ধীরে ছাড়ুন এবং আবার চার সেকেন্ড বিরতি দিন। এই পদ্ধতিকে ‘বক্স ব্রিদিং’ বলা হয়। এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে।
সম্ভব হলে কিছু ঠান্ডা পানি পান করুন বা মুখে ও চোখে পানি দিন। এতে শরীর ও স্নায়ু কিছুটা শান্ত হতে পারে।
মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে আনতে ‘গ্রাউন্ডিং টেকনিক’ ব্যবহার করা যায়। চারপাশে পাঁচটি দৃশ্যমান জিনিস দেখুন, চারটি বস্তু স্পর্শ করুন, তিনটি শব্দ শুনুন, দুটি গন্ধ শনাক্ত করুন এবং একটি স্বাদ অনুভব করার চেষ্টা করুন। এতে মন বর্তমান মুহূর্তে ফিরে আসে এবং ভয় ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি বারবার প্যানিক অ্যাটাক হয় এবং সবসময় আবার অ্যাটাক হওয়ার ভয় কাজ করে, তাহলে এটি প্যানিক ডিজঅর্ডারের লক্ষণ হতে পারে। এছাড়া এই ভয়ে যদি বাইরে যাওয়া, জনসমাগমে থাকা, অফিস করা বা পড়াশোনা ব্যাহত হয়, তাহলে অবশ্যই একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি বা সিবিটি প্যানিক ডিজঅর্ডার চিকিৎসার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিগুলোর একটি।
প্রতিরোধে যা করবেন
-অতিরিক্ত কফি, এনার্জি ড্রিংকস ও ক্যাফেইনসমৃদ্ধ খাবার কমিয়ে দিন। কারণ ক্যাফেইন হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে প্যানিকের অনুভূতি বাড়াতে পারে।
-প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন। ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার না করলে ঘুমের মান ভালো থাকে এবং মানসিক চাপও কমে।
-প্যানিক অ্যাটাকে আক্রান্ত ব্যক্তির চারপাশে ভিড় করবেন না বা একসঙ্গে অনেক প্রশ্ন করবেন না। বরং শান্তভাবে পাশে থাকুন এবং তাকে আশ্বস্ত করুন- ‘তুমি নিরাপদ আছো, আমি তোমার পাশে আছি।’
-তাকে জোর করে কোথাও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করে আরাম করে বসতে বা শুয়ে থাকতে সাহায্য করুন। প্রয়োজন হলে খোলা বাতাসের ব্যবস্থা করুন।
প্যানিক অ্যাটাক ভয়াবহ মনে হলেও এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী নয়। সঠিক তথ্য জানা, আতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই হতে পারে এই সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।



