বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬
স্বাস্থ্য

বছরে কোটি টাকার ওষুধ, এখন মিলছে লাখ টাকারও কমে! স্বস্তিতে বিরল রোগের রোগীরা

MEDI_2

মাত্র কয়েক মাস বয়স থেকেই শুরু হয়েছিল কাশি, শ্বাসকষ্ট আর হজমের জটিলতা। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল, দেশ থেকে বিদেশ- বছরের পর বছর ছুটেও মিলছিল না কার্যকর চিকিৎসা। অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিরল জেনেটিক রোগ সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত ছয় বছরের আদিল রহমানের জীবনে এসেছে আশার আলো।

গত ১৫ জুন প্রথমবারের মতো সিস্টিক ফাইব্রোসিসের নির্দিষ্ট ওষুধ ট্রাইকো গ্রহণ করে আদিল। এরপর মাত্র তিনটি ডোজেই দেখা গেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। পরিবারের ভাষ্য, আগের তুলনায় তার ক্ষুধা বেড়েছে, শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে এবং দীর্ঘদিন পর আবারও স্কুলে ফিরতে পেরেছে সে। আদিলের বাবা ব্যবসায়ী মো. মোস্তাফিজুর রহমান মুন্সি বলেন, ছেলের বয়স যখন মাত্র কয়েক মাস, তখন থেকেই বারবার কাশি ও তেলতেলে মলের মতো সমস্যা দেখা দিত। প্রথমে এগুলোকে সাধারণ অসুস্থতা মনে হলেও তিন বছর বয়সে একজন চিকিৎসক সিস্টিক ফাইব্রোসিসের সন্দেহ করেন। পরে ভারতের দিল্লিতে জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়, আদিল বিরল এই রোগে আক্রান্ত।

সিস্টিক ফাইব্রোসিস এমন একটি বংশগত রোগ, যেখানে ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্রে ঘন ও আঠালো শ্লেষ্মা জমে শ্বাসপ্রশ্বাস ও হজমে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে রোগীর আয়ুও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
বিশ্বে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে আরও প্রায় ৮০ হাজার রোগী এখনো শনাক্তই হয়নি। বাংলাদেশে রোগীর সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও চিকিৎসকদের ধারণা, প্রায় দুই হাজার মানুষ সিস্টিক ফাইব্রোসিসে ভুগছেন। এতদিন দেশে এই রোগের নির্দিষ্ট ওষুধ না থাকায় রোগীদের কেবল উপসর্গ নিয়ন্ত্রণের চিকিৎসাই নিতে হতো। আদিলও বছরের পর বছর নেবুলাইজেশন, চেস্ট ফিজিওথেরাপি, এনজাইম ও ভিটামিন সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভরশীল ছিল। আদিলের বাবা আগে থেকেই জানতেন যুক্তরাষ্ট্রে এই রোগের কার্যকর ওষুধ রয়েছে। কিন্তু সেই ওষুধের বার্ষিক খরচ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার, যা তাদের মতো পরিবারের পক্ষে বহন করা ছিল সম্পূর্ণ অসম্ভব।

ছেলের চিকিৎসার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হন। এমনকি চিকিৎসার সুবিধার আশায় বিদেশে স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রয়োজন হয়নি। বাংলাদেশে বেক্সিমকো ফার্মা একই কার্যকারিতার ওষুধ ট্রাইকো তৈরি করায় বদলে গেছে পরিস্থিতি। এখন আদিলের চিকিৎসায় বছরে খরচ হবে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, যা আগের তুলনায় বহু গুণ কম। বেক্সিমকো ফার্মা জানিয়েছে, ট্রাইকোর দাম মূল ওষুধের তুলনায় প্রায় ৯৬ শতাংশ কম রাখা হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মেধাস্বত্ব ছাড়ের সুবিধা কাজে লাগিয়েই এটি সম্ভব হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাব্বুর রেজা বলেন, ওষুধ তৈরি করার মূল উদ্দেশ্যই ছিল রোগীদের নাগালের মধ্যে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়া। কয়েক বছর ধরে গবেষণা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন ও মান নিশ্চিত করার পর অবশেষে তারা এই ওষুধ বাজারে আনতে সক্ষম হয়েছেন।

তিনি জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগী ও তাদের পরিবারের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক থেকেই এই উদ্যোগের শুরু। অনেক মা কাঁদতে কাঁদতে তাদের সন্তানের জীবন বাঁচানোর আবেদন জানিয়েছিলেন। সেই আবেগই তাদের এই ওষুধ তৈরির অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিদেশি রোগীরাও সরকার অনুমোদিত বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে এই ওষুধ সংগ্রহ করতে পারবেন। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশের রোগীদের হাতে ট্রাইকো তুলে দিয়েছে বেক্সিমকো। রেজা জানান, ওষুধ নেওয়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকার এক রোগী, যিনি ১৮ বছর ধরে সিস্টিক ফাইব্রোসিসে ভুগছিলেন, জীবনে প্রথমবার মাকে বলেছিলেন- “আমার ক্ষুধা লেগেছে।”

আদিলের গল্প কিংবা ওই রোগীর এই একটি বাক্যই যেন বলে দেয়, অনেক সময় একটি সাশ্রয়ী ওষুধই বদলে দিতে পারে একটি পরিবারের পুরো জীবন।

ট্রাইকোবেক্সিমকো ফার্মাসিস্টিক ফাইব্রোসিসস্বস্তি