অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতা কি ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে?

ছোট্ট একটি শিশু পার্কে মাটিতে বসে খেলছে। হাতে কাদা, জামায় ধুলাবালি। এমন দৃশ্য দেখলে বেশির ভাগ অভিভাবকের প্রথম প্রতিক্রিয়া কী হয়? দ্রুত শিশুকে তুলে এনে হাত ধুয়ে দেওয়া, জামা পরিষ্কার করা, আর বারবার মনে করিয়ে দেওয়া—‘মাটি ছোঁবে না, জীবাণু আছে।’

আমাদের বেড়ে ওঠা যেন এমনই এক শিক্ষা দিয়ে শুরু হয়—জীবাণু মানেই শত্রু, আর পরিচ্ছন্নতাই সুস্থ থাকার একমাত্র উপায়। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। বরং সব জীবাণুকে দূরে সরিয়ে রাখার প্রবণতা কখনো কখনো আমাদের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সব জীবাণুই কি ক্ষতিকর?
একসময় ধারণা ছিল, মানুষের শরীর আর জীবাণু দুটি সম্পূর্ণ আলাদা জগৎ। এখন বিজ্ঞানীরা জানেন, আমাদের শরীরের ভেতর-বাইরে ট্রিলিয়ন সংখ্যক ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অন্যান্য অণুজীব বসবাস করে। এদের সম্মিলিত নাম মাইক্রোবায়োম।
এই অণুজীবদের অনেকেই আমাদের জন্য উপকারী। তারা খাবার হজমে সাহায্য করে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন তৈরিতে ভূমিকা রাখে, ক্ষতিকর জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে সঠিকভাবে কাজ করতে সহায়তা করে।
অর্থাৎ, মানুষের শরীর শুধু মানুষের নয়; এটি অসংখ্য উপকারী অণুজীবেরও একটি বাসস্থান।

ইমিউনিটি কীভাবে শেখে?
মানবদেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা জন্মগতভাবে সবকিছু চিনে আসে না। শিশুর জন্মের পর ধীরে ধীরে চারপাশের পরিবেশ, অণুজীব এবং বিভিন্ন উপাদানের সংস্পর্শে এসে সে শিখতে থাকে কোনটি ক্ষতিকর আর কোনটি নিরীহ।
একে অনেকটা নতুন নিয়োগ পাওয়া নিরাপত্তারক্ষীদের প্রশিক্ষণের সঙ্গে তুলনা করা যায়। যদি তারা কখনো বাস্তব পরিস্থিতির মুখোমুখি না হয়, তাহলে শত্রু আর সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য করাই কঠিন হয়ে পড়বে। ইমিউন সিস্টেমের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।
‘হাইজিন হাইপোথিসিস’ কী?
১৯৮৯ সালে ব্রিটিশ মহামারিবিদ ডেভিড স্ট্র্যাচান একটি গবেষণায় দেখান, বড় পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে অ্যালার্জির প্রবণতা তুলনামূলক কম। তাঁর ধারণা ছিল, শৈশবে বিভিন্ন অণুজীবের সংস্পর্শে আসা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে বিকশিত হতে সাহায্য করে।
পরে এই ধারণাই ‘হাইজিন হাইপোথিসিস’ নামে পরিচিতি পায়। যদিও বর্তমানে গবেষকরা বিষয়টিকে আরও বিস্তৃতভাবে দেখছেন, তবুও এটি ইমিউন সিস্টেম নিয়ে গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাহলে কি বেশি পরিষ্কার থাকা ক্ষতিকর?
এর উত্তর এককথায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, নিয়মিত হাত ধোয়া, নিরাপদ খাবার খাওয়া এবং পরিষ্কার পরিবেশে থাকা এখনো সুস্থ থাকার অন্যতম শর্ত। তবে সমস্যা তখনই তৈরি হতে পারে, যখন জীবনের প্রতিটি অণুজীবকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার চেষ্টা করা হয়।
অতিরিক্ত জীবাণুনাশক ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ কিংবা শিশুদের সব সময় সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত পরিবেশে রাখার ফলে স্বাভাবিক অণুজীবের বৈচিত্র্য কমে যেতে পারে বলে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অটোইমিউন রোগের সঙ্গে কি কোনো সম্পর্ক আছে?
গবেষকেরা বর্তমানে অ্যালার্জি, হাঁপানি এবং বিভিন্ন অটোইমিউন রোগের সঙ্গে মাইক্রোবায়োমের সম্পর্ক নিয়ে বিস্তর গবেষণা করছেন।
অটোইমিউন রোগে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভুলবশত নিজের শরীরকেই আক্রমণ করে। টাইপ–১ ডায়াবেটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস এবং ক্রোনস ডিজিজ এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
যদিও এসব রোগের পেছনে জিনগত বৈশিষ্ট্য, খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশ ও জীবনযাত্রাসহ একাধিক কারণ কাজ করে, তবুও অন্ত্রের অণুজীবের বৈচিত্র্যের পরিবর্তনের সঙ্গে কিছু রোগের সম্পর্ক নিয়ে বিজ্ঞানীরা আশাব্যঞ্জক তথ্য পাচ্ছেন।
বিজ্ঞানীরা কী বলছেন?
গবেষণায় দেখা গেছে, অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের বৈচিত্র্য কমে গেলে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার আচরণেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করে বলছেন, কোনো সম্পর্ক পাওয়া মানেই সেটিই রোগের একমাত্র কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনো সম্ভব নয়।
এ কারণে মাইক্রোবায়োম নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান এবং ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করছেন গবেষকেরা।
শিশুদের কি মাটিতে খেলতে দেওয়া উচিত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুকে সব ধরনের ময়লা বা সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি তাকে সব সময় জীবাণুমুক্ত পরিবেশে আটকে রাখাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
স্বাভাবিক পরিবেশে খেলা, প্রকৃতির সংস্পর্শে আসা, পোষা প্রাণীর সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা বাইরে খেলাধুলা করা—এসব অভিজ্ঞতা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অবশ্যই খেলাধুলার পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, নিরাপদ খাবার খাওয়া এবং টিকাদানসহ মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
সব জীবাণু আমাদের শত্রু নয়। বরং অদৃশ্য এই অণুজীবদের অনেকেই আমাদের শরীরের নীরব সহযোগী। তাই পরিচ্ছন্নতা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু অতিরিক্ত জীবাণুভীতি নয়।



