একের পর এক ভূমিকম্প: কেন হচ্ছে, কতটা ঝুঁকিতে আমরা?

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একের পর এক ভূমিকম্পের ঘটনা মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আফগানিস্তান, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, চিলি কিংবা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রায়ই শক্তিশালী ভূমিকম্পের খবর সামনে আসছে। এসব ঘটনা অনেকের মনেই প্রশ্ন তুলছে—ভূমিকম্প আসলে কী, কেন হয়, আফটারশক কী, এবং এমন পরিস্থিতিতে আমাদের কী করা উচিত?
ভূমিকম্প হলো পৃথিবীর অভ্যন্তরে সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ মুক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট কম্পন। পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ সবসময় স্থির নয়; এটি বিশাল কয়েকটি টেকটোনিক প্লেটের ওপর অবস্থান করছে, যেগুলো প্রতিনিয়ত খুব ধীরগতিতে নড়াচড়া করে। দীর্ঘদিন ধরে এসব প্লেটের মধ্যে চাপ জমতে থাকে। একসময় সেই চাপ সহ্যের সীমা অতিক্রম করলে ফল্ট লাইনে শিলা ভেঙে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ শক্তি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই শক্তিই ভূকম্পন বা ভূমিকম্প হিসেবে অনুভূত হয়।

কেন হয় ভূমিকম্প?
ভূমিকম্পের প্রধান কারণ হলো টেকটোনিক প্লেটের চলাচল। পৃথিবীর অধিকাংশ বড় ভূমিকম্প ঘটে দুটি প্লেটের সংঘর্ষ, ঘর্ষণ অথবা একটি প্লেটের অন্যটির নিচে ঢুকে যাওয়ার কারণে। এছাড়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিধস কিংবা বড় ধরনের মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড যেমন খনি বিস্ফোরণ বা বড় বাঁধ নির্মাণের কারণেও ছোট মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। তবে বিশ্বের প্রায় সব বড় ও ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্পের পেছনে টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়াই মূল কারণ।
ভূমিকম্প কি আগে থেকে জানা যায়?
বর্তমান বিজ্ঞান অনেক উন্নত হলেও এখনো কোনো প্রযুক্তি নেই যা নির্ভুলভাবে বলতে পারে ঠিক কখন, কোথায় এবং কত মাত্রার ভূমিকম্প হবে। তবে বিজ্ঞানীরা কোন অঞ্চলগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং কোথায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি, তা গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে পারেন। এ কারণেই ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকাগুলোতে আগাম প্রস্তুতির ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আফটারশক কী?
অনেকেই মনে করেন, মূল ভূমিকম্প শেষ হয়ে গেলে বিপদও শেষ। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। বড় ভূমিকম্পের পর একই এলাকায় যে ছোট বা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পগুলো ঘটে, সেগুলোকে আফটারশক বলা হয়। মূল ভূমিকম্পের ফলে ভূগর্ভের ফল্ট লাইনে নতুন ভারসাম্য তৈরি হতে সময় লাগে। সেই প্রক্রিয়ায় বারবার কম্পন অনুভূত হতে পারে। আফটারশক কয়েক ঘণ্টা, কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে।
আফটারশক কতটা বিপজ্জনক?
আফটারশককে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। কারণ মূল ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, সেতু বা অন্যান্য স্থাপনা আফটারশকের সময় সহজেই ধসে পড়তে পারে। অনেক সময় মূল ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে আফটারশকের কারণে আরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। তাই মূল কম্পন শেষ হওয়ার পরও সতর্ক থাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে প্রবেশ না করাই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
ভূমিকম্পের সময় কী করা উচিত?
ভূমিকম্প অনুভূত হলে প্রথমেই আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে। যদি ঘরের ভেতরে থাকেন, তাহলে শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিয়ে মাথা ও ঘাড় দুই হাত দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। জানালা, কাঁচ, ভারী আলমারি কিংবা ঝুলন্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থেকে দূরে থাকতে হবে। কম্পন চলাকালে লিফট ব্যবহার করা বা দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করা বিপজ্জনক হতে পারে। বাইরে থাকলে ভবন, গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও বিলবোর্ড থেকে দূরে খোলা জায়গায় চলে যেতে হবে। আর গাড়িতে থাকলে নিরাপদ স্থানে গাড়ি থামিয়ে কম্পন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভেতরেই অবস্থান করাই উত্তম।
কী করা উচিত নয়?
ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কে ছুটোছুটি করা, লিফটে ওঠা, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা গুজব ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। কম্পন থামার সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে ফিরে যাওয়াও ঠিক নয়। অনেক সময় ভবনের ভেতরের কাঠামো দুর্বল হয়ে যায়, যা পরবর্তী আফটারশকে ধসে পড়তে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রবেশ করা উচিত নয়।
বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে?
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ভূমিকম্পঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল এবং রাজধানী ঢাকাসহ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো বড় ধরনের ভূমিকম্পে উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির মুখে রয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ এবং জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে বড় ভূমিকম্প হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হতে পারে। তাই ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণ, নিয়মিত মহড়া এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।



