বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬
জীবনযাপন

ব্রাজিলের তিন বোনের সম্মিলিত বয়স ৩১৬ বছর, দীর্ঘায়ুর রহস্য নিয়ে চলছে গবেষণা

ব্রাজিলের তিন বোনের সম্মিলিত বয়স ৩১৬ বছর, দীর্ঘায়ুর রহস্য নিয়ে চলছে গবেষণা

মানুষ কীভাবে দীর্ঘদিন সুস্থ ও সচলভাবে বেঁচে থাকতে পারে? দীর্ঘায়ুর সেই গোপন রহস্য উদঘাটনে এবার গবেষকদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছেন ব্রাজিলের তিন বোন। চলতি মাসে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এই তিন বোনকে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক জীবিত সহোদর (ত্ৰয়ী) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমানে তাদের সম্মিলিত বয়স ৩১৬ বছর।

ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে বসবাসকারী এই তিন বোন হলেন— ১০৩ বছর বয়সি জুলিনা ডি দেউস নুনেস, ১০৪ বছর বয়সি জোরাইড ডি দেউস মোতা এবং ১০৯ বছর বয়সি লেভিতা ডি দেউস নুনেস। দীর্ঘায়ুর রেকর্ড যাচাইকারী বৈশ্বিক সংস্থা ‘লঞ্জেভিকুয়েস্ট’-এর মাধ্যমে তাদের চিহ্নিত করা হয়, যা পরবর্তীতে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস নিশ্চিত করে।

সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান জিনোম রিসার্চ সেন্টারের বিজ্ঞানী মায়ানা জাত্সের নেতৃত্বে বর্তমানে ‘ডিএনএ লঞ্জেভো প্রজেক্ট’ নামের একটি গবেষণা চলছে। এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য হলো বার্ধক্যের পেছনের জৈবিক কারণগুলো খুঁজে বের করা।

গবেষকরা মূলত ৯০ ও ১০০ বছরের বেশি বয়সি সুস্থ ব্যক্তিদের ডিএনএ-র সঙ্গে এমন ব্যক্তিদের তুলনা করছেন, যারা বার্ধক্যের কারণে শারীরিক দুর্বলতা, স্মৃতিভ্রম বা বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছেন। এর মাধ্যমে দীর্ঘায়ুর জন্য দায়ী প্রতিরক্ষামূলক জিনগুলো শনাক্ত করাই বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য।

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই তিন বোনের জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে মানুষের বয়স বাড়ার জৈবিক প্রক্রিয়া এবং বার্ধক্যেও কীভাবে কেউ কেউ শারীরিকভাবে সক্ষম ও মানসিকভাবে প্রাণবন্ত থাকেন, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।

ব্রাজিলের সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন বিজ্ঞানী মায়ানা জাটসের নেতৃত্বে ‘ডিএনএ লোঞ্জেভো প্রকল্প’ নামক একটি গবেষণার আওতায় এই তিন বোনের শারীরিক ও জিনগত পরীক্ষা করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়টির হিউম্যান জিনোম রিসার্চ সেন্টারের সমন্বয়ক মায়ানা জাটস বলেন, ‘ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা মূলত মানুষের শরীরে থাকা এমন কিছু ‘সুরক্ষামূলক জিন’ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি, যা বার্ধক্যজনিত রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। আমাদের গবেষণায় যত বেশি শতায়ু মানুষ—বিশেষ করে একই পরিবারের একাধিক শতায়ু সদস্য অংশ নেবেন, আমাদের অনুসন্ধান তত বেশি নিখুঁত হবে।’

গবেষকেরা নব্বই ঊর্ধ্ব ও শতায়ু ব্যক্তিদের শারীরিক অবস্থার সঙ্গে এমন প্রবীণদের তুলনা করবেন যারা ইতিমধ্যেই স্মৃতিভ্রংশ, শারীরিক দুর্বলতা বা কোনো দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছেন। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, জীবনের শেষভাগে এসে সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকার পেছনে পরিবেশগত প্রভাবের চেয়ে বংশগত বা জিনগত কারণ অনেক বেশি ভূমিকা পালন করে।

৩১৮ বছরের দীর্ঘ পথচলা

লংজেভিকুয়েস্ট নামক একটি বৈশ্বিক সংস্থা, যারা দীর্ঘজীবী মানুষের রেকর্ড যাচাই করে এবং গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের সহযোগী হিসেবে কাজ করে, এই তিন বোনকে চিহ্নিত করেছে।
রিও ডি জেনিরোর বাসিন্দা এই তিন বোন হলেন— লেভিতা দে দেউস নুনেস (১০৯ বছর), জোরাইদে দে দেউস মোতা (১০৪ বছর), জুলিনা দে দেউস নুনেস (১০৩ বছর)।

লংজেভিকুয়েস্ট-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বেন মেয়ার্স বলেন, ‘বোনেরা যখন এই বয়সে পৌঁছান, তখন সেখানে স্পষ্টতই একটি শক্তিশালী জিনগত উপাদানের ভূমিকা থাকে। তবে যেহেতু তারা একে অপরের কাছাকাছি থাকেন, তাই তাদের মধ্যে একটি চমৎকার পারিবারিক ও সামাজিক সমর্থনও রয়েছে। দীর্ঘায়ু হওয়ার পেছনে এই সামাজিক ও মানসিক শক্তিরও বড় অবদান রয়েছে।’

বিজ্ঞানীদের গবেষণা চললেও, তিন বোন তাদের এই দীর্ঘ জীবনের কৃতিত্ব দিয়েছেন সাধারণ জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসকে। ১০৩ বছর বয়সী বোন জুলিনা তার শৈশবের স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘আমাদের শৈশব কেটেছে নদীতে সাতার কেটে আর মাছ ধরে। তখন সবকিছুই তাজা পাওয়া যেত। আমাদের ঘরে কোনো রেফ্রিজারেটরও (ফ্রিজ) ছিল না।’ অন্যতম বোন জোরাইদে শিশুদের মাতৃদুগ্ধ পানের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেন।

দীর্ঘ জীবনে তারা সাধারণ পেশা ও পারিবারিক দায়িত্বই পালন করেছেন। বড় বোন লেভিতা কারুশিল্পী হিসেবে কাজ করার পর একটি টেলিভিশন চ্যানেলে চাকরি করেছেন। জোরাইদে পেশায় ছিলেন নার্স এবং তিনি পাঁচ সন্তান লালন-পালন করেছেন। আর জুলিনা গৃহিণী হিসেবে সামলেছেন তার ছয় সন্তানকে।

১০৯ বছর বয়সী লেভিতা তার জীবন নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই জানিয়ে বলেন, ‘আমার শৈশব ও কৈশোর চমৎকার কেটেছে। আমার কোনো অভিযোগ নেই।’

গবেষকেরা বোঝার চেষ্টা করছেন কীভাবে জীবনযাত্রার চেয়ে জিনগত কারণগুলো মানুষের হৃদ্যন্ত্র, পেশি এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাকে বার্ধক্যের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করে।
গবেষক দলের সদস্য জোয়াও পাওলো গুইলহার্মে বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য অন্তত ৫০০ জন শতায়ু মানুষের ওপর গবেষণা সম্পন্ন করা, যাতে আমরা মানুষের দীর্ঘায়ু নিয়ে আরও চূড়ান্ত এবং সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি।’

তিন বোনদীর্ঘায়ুব্রাজিল