আশুরায় বিশেষ খাবারের আয়োজন নিয়ে ইসলাম কী বলে?

ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুহাররমের ১০ তারিখ তথা আশুরার দিন রোজা পালন করা ফরজ ছিল। কিন্তু পবিত্র রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরার রোজার ফরজিয়্যত বাতিল হয়ে যায়। রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পরও আল্লাহর রাসুল (সা.) আশুরার রোজাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। এ জন্য আশুরার দিন রোজা রাখা সুন্নাত।
আশুরার দিন রোজা রাখা ছাড়াও আরও একটি আলোচিত বিষয় রয়েছে, সেটি হলো, দিনটিকে কেন্দ্র করে পরিবার-পরিজনের জন্য ভালো খাবারের আয়োজন করা। হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আশুরার দিন তার পরিবার-পরিজনের জন্য স্বচ্ছলতার (ভালো খাবারের) ব্যবস্থা করবে আল্লাহ তাকে পূর্ণ বছর স্বচ্ছলতার সঙ্গে রাখবেন। (আল মু’জামুল কাবির, তাবারানি, শুয়াবুল ঈমান, বায়হাকী)
এই হাদিসটি সম্পর্কে মুহাদ্দিসরা দুইভাগে বিভক্ত। কেউ কেউ এটিকে জাল আখ্যায়িত করলেও অনেকে বলেছেন, এটি জঈফ বা দুর্বল। একইসঙ্গে তারা এটিও বলেছেন, একাধিক সনদে বর্ণিত হওয়ার কারণে হাদিসটি হাসান পর্যায়ের। যারা এটিকে জঈফ ও হাসান বলেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন– ইমাম সুয়ূতি, মোল্লা আলি কারি, ইবনে আররাক, আবদুল হাই লাখনোভী (রহ.) প্রমুখ। শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.) মুহাদ্দিসদের বক্তব্যগুলোকে সামনে রেখে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, হাদিসটি জাল নয়; বরং জঈফ।
কোনও বিষয়ের মর্যাদা ও ফজিলত প্রমাণের ক্ষেত্রে জঈফ হাদিস দ্বারা দলীল পেশ করা সর্বজনবিদিত। আর সাধারণ জঈফ হাদিস বলতে বানোয়াট হাদিসকে বোঝায় না; বরং হাদিসের সনদ বা সূত্রগত দুর্বলতা থাকলে সেটাকে জঈফ বলা হয়। তাই এ হাদিসের ওপর আমল করে আশুরার দিন পরিবার-পরিজনের জন্য ভালো খাবারের আয়োজন করা যেতে পারে।
কিন্তু যেহেতু অনেক মুহাদ্দিস হাদিসটিকে জাল তথা বানোয়াট বলেছেন, এ জন্য হাদিসটির ওপর বেশি গুরুত্ব না দেওয়া উচিৎ। তবে যদি কেউ অন্য মুহাদ্দিসদের কথা (হাদিসটি জঈফ ও আমলযোগ্য) মেনে নিয়ে আশুরার দিন পরিবার-পরিজনের জন্য ভালো খাবারের আয়োজন করেন, তাহলে তাকে বাধা দেওয়া উচিৎ নয়।
তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন উক্ত কাজকে সাওয়াবের কাজ মনে করা না হয়। বরং আল্লাহর কাছে সারা বছরের উত্তম রিজিকের আশা-আকাঙ্খার প্রতীকী পদ্ধতি হিসেবে নেকফালি মনে করবে। [ফাতাওয়া নাওয়াজেল-১/৫০৫, আহসানুল ফাতাওয়া-১/৩৯৫, ১/৫১৩]
نا مُحَمَّدٌ، نا مُحَمَّدٌ، نا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ سَلَمَةَ الْجُهَنِيُّ، عَنِ ابْنِ أَبِي صَعْصَعَةَ، عَنْ أَبِيهِ عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ وَسَّعَ عَلَى عِيَالِهِ يَوْمَ عَاشُورَاءَ أَوْسَعَ اللَّهُ عَلَيْهِ سَنَتَهُ»
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিন তার পরিবারের উপর সচ্ছলতা দেখাবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য উক্ত বছরকে সচ্ছল করে দিবেন।’[মু’জামে ইবনুল আরাবী, হাদীস নং-২২৫, আলমুজামুল আওসাত, হাদীস নং-৯৩০২, আলমু’জামুল কাবীর, হাদীস নং-১০০০৭, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-৩৫১৩, ৩৫১৫, ৩৫১৬]
ইমাম বায়হাকী উক্ত হাদীস একাধিক সনদে আনার পর মন্তব্য করেন:
هَذِهِ الْأَسَانِيدُ وَإِنْ كَانَتْ ضَعِيفَةً فَهِيَ إِذَا ضُمَّ بَعْضُهَا إِلَى بَعْضٍ أَخَذَتْ قُوَّةً،
এই সনদগুলো যদিও জঈফ। কিন্তু এসব যখন একটি অন্যটির সঙ্গে মিলেছে তখন তা শক্তিশালী হয়ে গেছে। [শুয়াবুল ঈমান লিলবায়হাকী, হাদীস নং-৩৫১৫, খন্ড-৫, পৃষ্ঠা ৩৩৩]
তবে এক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় হল, পরিবারের ওপর সাধ্যানুপাতে খরচ করা জায়েজ আছে। বা খরচ করা উচিত। কিন্তু এদিন সম্মিলিতভাবে খিচুরী পাকানো, বিশাল খাবারের আয়োজন করে বিলানো, এসবই খারেজীদের সঙ্গে মিলে যায়। যা সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য ও নাজায়েজ।



