মশার রাজত্বে মানুষ প্রজা: ডেঙ্গুর কাছে বারবার পরাজয় কেন?

বর্ষা এলেই বাংলাদেশের মানুষের জীবনে এক অদ্ভুত নিয়মিত অতিথির আগমন ঘটে। সে কোনো আত্মীয় নয়, কোনো উৎসবও নয়। সে আসে নিঃশব্দে, ছোট্ট ডানায় ভর করে। নাম তার এডিস মশা। আর তার উপহার- ডেঙ্গু।
প্রতি বছরই ডেঙ্গু আসে, মানুষ আতঙ্কিত হয়, হাসপাতাল ভরে যায়, সংবাদমাধ্যমে সতর্কবার্তা ছাপা হয়, কর্তৃপক্ষ অভিযান চালায়। তারপর শীত এলেই সবাই যেন বিষয়টি ভুলে যায়। পরের বছর আবার একই গল্প। যেন আমরা এমন এক চক্রে আটকে গেছি, যেখানে মশা বদলায় না, বদলায় না আমাদের প্রস্তুতিও।

গত বছর বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ছিল বিশেষভাবে ভয়াবহ।
হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে অনেক জায়গায় শয্যা সংকট দেখা দেয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছিল শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার এবং মৃত্যুর সংখ্যা। অনেক পরিবার তাদের সন্তানের জ্বরকে সাধারণ ভাইরাল ভেবে গুরুত্ব দেয়নি। পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ছুটতে হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তখন আর কিছু করার ছিল না। ডেঙ্গু আসলে একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা এডিস মশার কামড়ে ছড়ায়। এই মশা সাধারণ মশার মতো নোংরা পানিতে নয়, বরং পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। ফুলের টব, এসির ট্রে, পরিত্যক্ত বোতল, টায়ার কিংবা ছাদের কোনো কোণে জমে থাকা সামান্য পানিও এদের জন্য যথেষ্ট।
মজার ব্যাপার হলো, আমরা অনেকেই ভাবি ডেঙ্গু একটি মৌসুমি সমস্যা। কিন্তু বাস্তবে এটি এখন নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত ফল। শহর বড় হচ্ছে, নির্মাণকাজ বাড়ছে, কিন্তু পানি নিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেই হারে উন্নত হচ্ছে না। ফলে এডিস মশার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, ডেঙ্গু হলে মানুষ মারা যায় কেন?

অনেকে মনে করেন, ডেঙ্গু মানেই শুধু জ্বর। বাস্তবে বিষয়টি অনেক জটিল। ডেঙ্গু ভাইরাস শরীরের রক্তনালি ও প্লাটিলেটের ওপর প্রভাব ফেলে। গুরুতর ক্ষেত্রে শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ শুরু হতে পারে, রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে এবং বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একে বলা হয় ‘সিভিয়ার ডেঙ্গু’ বা ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোম’।
সমস্যা হলো, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর বড় কারণ শুধু রোগ নয়, রোগ সম্পর্কে ভুল ধারণাও। অনেকেই জ্বর কমে গেলে মনে করেন রোগ সেরে গেছে। অথচ ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় অনেক ক্ষেত্রে জ্বর কমার পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা। এই সময় রোগীর শরীরে জটিলতা দেখা দিতে পারে। দেরিতে হাসপাতালে যাওয়া বা সতর্ক সংকেত না বোঝার কারণে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। শিশুরা ডেঙ্গুতে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। কারণ তারা অনেক সময় নিজেদের উপসর্গ ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না। তাছাড়া তাদের শরীরে পানিশূন্যতা দ্রুত তৈরি হতে পারে। গত বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ডেঙ্গু শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, ডেঙ্গু প্রতিরোধের উপায় জানা থাকলেও আমরা তা নিয়মিত অনুসরণ করি না। মশার জন্মস্থান ধ্বংস করার দায়িত্ব শুধু সিটি করপোরেশন বা সরকারের নয়। একটি বাড়ির বারান্দায় জমে থাকা পানিও পুরো মহল্লার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত প্রবণতা আছে। বিপদ যখন দরজায় কড়া নাড়ে, তখন আমরা সচেতন হই। কিন্তু বিপদ চলে গেলে আবার সব ভুলে যাই। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও তাই হয়। বর্ষা এলেই সবাই মশা নিয়ে আলোচনা শুরু করে, আর শীত এলে যেন এডিস মশাও নাগরিক আলোচনার বাইরে চলে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘস্থায়ী আর্দ্র আবহাওয়া এডিস মশার বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে ডেঙ্গু এখন শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ নয়; দেশের বিভিন্ন জেলায়ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো প্রতিরোধ। সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাসা ও আশপাশের জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা, মশারি ব্যবহার করা, জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং সতর্ক সংকেত সম্পর্কে জানা-এসবই জীবন বাঁচাতে পারে।
ডেঙ্গু কোনো রহস্যময় রোগ নয়। এর কারণ জানা, প্রতিরোধের উপায়ও জানা। তবু প্রতি বছর আমরা একই ভুল করি, একই ক্ষতি দেখি, একই শোক বহন করি। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি, নাকি শুধু বর্ষা এলেই কয়েক মাসের জন্য আতঙ্কিত হওয়ার অভিনয় করছি?
ছোট্ট একটি মশার কাছে বারবার পরাজিত হওয়ার চেয়ে বড় ব্যঙ্গ আর কী হতে পারে? প্রযুক্তি, উন্নয়ন আর স্মার্ট নগরীর গল্পের মাঝেও যদি একটি মশা আমাদের হাসপাতাল, পরিবার ও ভবিষ্যৎকে কাঁপিয়ে দিতে পারে, তাহলে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই আসলে শুধু স্বাস্থ্যগত নয়- এটি আমাদের নাগরিক দায়িত্ববোধেরও পরীক্ষা।



