যে আচরণগুলো একসময় সন্তানকে মা-বাবা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়

মা-বাবা ও সন্তানের সম্পর্ককে সাধারণত সবচেয়ে নিরাপদ ও গভীর বন্ধন হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বড় হওয়ার পর সন্তান ধীরে ধীরে পরিবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, এমনকি কেউ কেউ একপর্যায়ে সম্পর্কও ছিন্ন করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত হঠাৎ আসে না; দীর্ঘদিনের মানসিক আঘাত, অবহেলা এবং সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা অস্বস্তিই এর পেছনে কাজ করে।

সম্প্রতি কয়েকজন গবেষকের করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, মা-বাবা ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের মধ্যে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কারণ নিয়ে দুই পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পার্থক্য রয়েছে। গবেষণাটি করেছেন ক্রিস্টেন কার, আমান্ডা হোলম্যান, পি এ জেনা স্টিফেনসন অ্যাবেটজ এবং জোডি কোয়েনিগ কেলাস। সেখানে ৮৯৮ জন মা-বাবা ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক মা-বাবা মনে করেন সন্তানের অতিরিক্ত অধিকারবোধ, বন্ধু বা জীবনসঙ্গীর প্রভাব সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি করে। অন্যদিকে সন্তানেরা বলছে, দীর্ঘদিন ধরে বিষাক্ত আচরণ, অতিরিক্ত সমালোচনা, অসম্মান এবং আবেগগত সমর্থনের অভাবই সম্পর্ক ভাঙনের বড় কারণ।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কাজী রুমানা হক বলছেন, অনেক মা-বাবা মনে করেন সন্তান যেহেতু তাদের মাধ্যমে পৃথিবীতে এসেছে, তাই তাকে নিজের ইচ্ছামতো চলতে হবে। কিন্তু সন্তান একজন আলাদা মানুষ, তারও নিজস্ব মতামত ও অনুভূতি আছে। এই জায়গাটি উপেক্ষা করা হলে ধীরে ধীরে সম্পর্কে ফাটল তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তানের অর্জনকে ছোট করে দেখা, সবসময় অতিরিক্ত প্রত্যাশা রাখা, ভুল করলে অপমান করা বা বারবার তুলনা করা—এসব আচরণ সন্তানের মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ তৈরি করতে পারে। অনেক সন্তান ছোটবেলার সেই অভিজ্ঞতা বড় হওয়ার পরও ভুলতে পারে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সন্তান পালনের ধরন। যেসব পরিবারে নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ বেশি, যেখানে সন্তানের মতামতের চেয়ে মা-বাবার ইচ্ছাকেই সবসময় প্রাধান্য দেওয়া হয়, সেখানে সম্পর্কের দূরত্ব দ্রুত বাড়তে দেখা যায়। বিশেষ করে মা-বাবা নিজেদের অপূর্ণ ইচ্ছা সন্তানের মাধ্যমে পূরণ করতে চাইলে সেই চাপ সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক মা-বাবা সন্তানের কষ্টকে অভিজ্ঞতা হিসেবে না দেখে অভিযোগ হিসেবে নেন। ফলে সন্তান যখন বারবার নিজের অনুভূতির কথা বলেও গুরুত্ব পায় না, তখন একসময় দূরে সরে যাওয়াকেই নিজের মানসিক শান্তি রক্ষার উপায় হিসেবে বেছে নেয়।
গবেষকদের মতে, মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ বেশির ভাগ সময় প্রতিশোধ নয়। বরং এটি দীর্ঘদিনের না-বলা কষ্ট, না-শোনা অনুভূতি এবং নিজের আত্মসম্মান ও মানসিক সুস্থতা রক্ষার জন্য নেওয়া কঠিন এক সিদ্ধান্ত।



