বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬
জীবনযাপন

চুইংগাম চিবালে কি সত্যিই স্ট্রেস কমে?

images (4)

চুইংগাম চিবানো শুধু মুখ সতেজ রাখার অভ্যাস নয়—এটি মানসিক চাপ, মনোযোগ এবং মস্তিষ্কের কার্যক্রমের সঙ্গেও কিছুটা সম্পর্কিত বলে দাবি করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে চুইংগাম কোম্পানিগুলোও তাদের প্রচারণায় বলছে, গাম চিবানো স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু বিজ্ঞাপনের এই দাবি কতটা বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য?

চুইংগামের দীর্ঘ ইতিহাস

চুইংগামের ইতিহাস নতুন নয়। প্রায় আট হাজার বছর আগেও মানুষ বার্চ গাছের আঠা চিবাত বলে ধারণা করা হয়। তখন এটি শুধু আনন্দের জন্য নয়, কখনো যন্ত্রপাতি জোড়া লাগানোর কাজেও ব্যবহার হতো। এমনকি বিভিন্ন প্রাচীন সভ্যতায়—গ্রিস, স্ক্যান্ডিনেভিয়া, মায়া ও আমেরিকায়—গাছের আঠা চিবানোর প্রমাণ পাওয়া যায়।

আধুনিক চুইংগামের যাত্রা শুরু হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। ১৮৫০ সালের দিকে নিউইয়র্কের টমাস অ্যাডামস মেক্সিকোর এক নির্বাসিত রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে “চিকল” নামের গাছের আঠা পান। প্রথমে তিনি এটি দিয়ে রাবার তৈরির চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তৈরি হয় চুইংগাম।

এরপর ব্যবসায়িকভাবে এটিকে জনপ্রিয় করেন উইলিয়াম রিগলি। তিনি সাবান ও বেকিং সোডার সঙ্গে চুইংগাম বিনামূল্যে দিয়ে প্রচারণা চালাতেন। পরে বুঝতে পারেন, মানুষ গাম বেশি পছন্দ করছে—তাই তিনি পুরো ব্যবসাই চুইংগামে রূপান্তর করেন।

প্রচারণা ও জনপ্রিয়তার বিস্তার

রিগলি বিশ্বাস করতেন, একবার মানুষের হাতে চুইংগাম পৌঁছাতে পারলেই এটি জনপ্রিয় হবে। তিনি ব্যাপক বিজ্ঞাপন চালান, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ফোনবুকে থাকা ঠিকানাগুলোতেও গাম পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

মহামন্দার সময় তিনি লক্ষ্য করেন, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষ বেশি চিবায়। এই সুযোগে বিজ্ঞাপনে বলা হয়, চুইংগাম মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাদের রেশনে চুইংগাম অন্তর্ভুক্ত করাতে তিনি সফল হন—কারণ দাবি করা হয়, এটি ক্ষুধা কমায় ও মনোযোগ বাড়ায়।

বিজ্ঞাপনের দাবি বনাম বাস্তবতা

চুইংগাম নিয়ে অনেক গবেষণা হলেও সব ফল একরকম নয়। কিছু গবেষণা বলছে, চুইংগাম সত্যিই মনোযোগ কিছুটা বাড়াতে পারে, তবে এটি স্মৃতিশক্তি বাড়ায় বা বড় ধরনের স্ট্রেস দূর করে—এমন প্রমাণ শক্ত নয়।

কার্ডিফ ইউনিভার্সিটি ও নর্থামব্রিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, গাম চিবানো স্মৃতি উন্নত করে না এবং বড় মানসিক চাপ কমাতেও বিশেষ ভূমিকা রাখে না। তবে এটি একঘেয়ে কাজের সময় মনোযোগ কিছুটা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

মস্তিষ্কে কী ঘটে?

বিজ্ঞানীদের মতে, চুইংগাম চিবালে মুখ ও চোয়ালের পেশি সক্রিয় হয়, ফলে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ সামান্য বাড়তে পারে। এতে মানুষ তুলনামূলকভাবে সতর্ক অনুভব করে। আবার একই কাজ বারবার করার কারণে মস্তিষ্ক এক ধরনের “অটোমেটিক মুভমেন্ট”-এ ব্যস্ত থাকে, যা মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

আরেকটি ধারণা হলো, চিবানোর ফলে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের প্রতিক্রিয়া কিছুটা ধীর হতে পারে, ফলে সাময়িকভাবে চাপ কম অনুভূত হয়। তবে এই বিষয়ে গবেষণার ফল একরকম নয়।

মনোযোগ ও অস্থিরতা

গবেষণায় দেখা গেছে, চুইংগাম চিবানো মনোযোগ প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। বিশেষ করে বিরক্তিকর বা একঘেয়ে কাজের সময় এটি কিছুটা সহায়ক হতে পারে।

মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বা ‘ফিজেটিং’ প্রবণতার সঙ্গেও এর সম্পর্ক আছে। যেমন কেউ পা নাড়ায় বা কলম ঘোরায়—চুইংগাম চিবানোও অনেকটা একই ধরনের স্বাভাবিক আচরণ, যা মনকে সক্রিয় রাখে।

উপকার নাকি ক্ষতি?

সব মিলিয়ে বলা যায়, চুইংগাম মস্তিষ্কের জন্য কোনো ক্ষতিকর বিষয় নয়, আবার এটি কোনো ‘চমৎকার চিকিৎসা’ও নয়। এটি সাময়িকভাবে মনোযোগ বাড়াতে বা হালকা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু বড় ধরনের মানসিক সমস্যা বা স্ট্রেস সমাধানের উপায় নয়।

অভ্যাসচুইংগামস্ট্রেস