অশ্লীলতা নাকি শিল্প? বিতর্কে হরপ্পার ‘ডান্সিং গার্ল’

লম্বাটে মুখ, নগ্ন দেহ, পেটের কাছে সামান্য মেদের রেখা, হাতে অসংখ্য চুড়ি আর গলায় হার—এভাবেই বর্ণনা করা যায় কালো রঙের একটি নারী মূর্তিকে, যার বয়স আনুমানিক চার হাজার বছরেরও বেশি। সিন্ধু সভ্যতার হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো প্রত্নস্থলে খননকাজে আবিষ্কৃত এই বিখ্যাত ভাস্কর্য ‘ডান্সিং গার্ল’ আবারও নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে।
সাম্প্রতিক বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে ভারতের ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি) প্রকাশিত নতুন পাঠ্যবইকে ঘিরে। ক্লাস সিক্সের সমাজবিজ্ঞান বইয়ে মূর্তিটির ছবিতে বুক থেকে নিচের অংশের অনেকটা ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
ছবিটির এই পরিবর্তিত সংস্করণ প্রকাশ্যে আসার পরই ভারতজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়।
অনেকের মতে, ডান্সিং গার্ল একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম; একে শ্লীলতা-অশ্লীলতার মানদণ্ডে বিচার করা উচিত নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্থাপিত এমন মতামতের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন এনসিইআরটির টেক্সটবুক ডেভেলপমেন্ট কমিটির প্রধান মাইকেল ড্যানিও।
সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘নগ্নতা মানেই অশ্লীলতা—এ ধারণা ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার অংশ। আমরা যখন শিক্ষাকে ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত করার কথা বলছি, তখন এই মূর্তিকে যদি তার প্রকৃত রূপে উপস্থাপন না করি, তাহলে বুঝতে হবে কোথাও একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে’।
তিনি আরও জানান, ক্লাস সিক্সের শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে কারও কাছ থেকেই এই মূর্তিকে অশ্লীল বলে মনে হওয়ার কথা শোনা যায়নি।
তার ভাষায়, ‘আমাকে বলা হয়েছিল যে এই মূর্তি ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত নয়। কিন্তু আমাদের টিম সে মতের সঙ্গে একমত হতে পারেনি’। তবে কে বা কারা এমন মত দিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাননি।
তবে এটিই প্রথমবার নয় যে ডান্সিং গার্ল বিতর্কের জন্ম দিল। ১৯২৬ সালে মহেঞ্জোদারোর এইচআর এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়ার পর থেকেই মূর্তিটি নানা সময়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। আর সেই বিতর্কগুলোর বড় অংশই ঘুরেছে ‘অশ্লীলতা’ ও ‘শালীনতা’ নিয়ে।
শালীনতা নিয়ে প্রশ্ন পাকিস্তানেও
১৯২৬ সালে আবিষ্কারের পর ডান্সিং গার্লকে রাখা হয়েছিল অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে। সে সময় ব্রিটিশ সরকার দিল্লিতে ‘সেন্ট্রাল ইম্পিরিয়াল মিউজিয়াম’ নির্মাণের কাজ শুরু করেছিল।
রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরের পর নতুন রাজধানীতে কলকাতার মতো সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক অবকাঠামো গড়ে তোলাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটি দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়াম নামে পরিচিত।
পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে ইতিহাসবিদ আশীষ কুমার উল্লেখ করেছেন, ভারতের পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের (এএসআই) তৎকালীন মহাপরিচালক মর্টিমার হুইলার ১৯৪৪ সালের দিকে মহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া ১২ হাজারেরও বেশি প্রত্নবস্তু দিল্লিতে নিয়ে আসেন।
এর অল্প কিছুদিন পরই দেশভাগের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।
হরপ্পা সভ্যতার কিছু ছোট প্রত্নস্থল ভারতের অংশে পড়লেও মহেঞ্জোদারোর মতো গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ প্রত্ননগরী পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।
আশীষ কুমারের ভাষায়, ‘মহেঞ্জোদারো থেকেই হরপ্পা সভ্যতার অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিল। আর মহেঞ্জোদারো পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় পাকিস্তান প্রথমে সব প্রত্নবস্তু ফেরত চেয়েছিল’।
পরবর্তীতে মর্টিমার হুইলারের মধ্যস্থতায় সিদ্ধান্ত হয়, মহেঞ্জোদারো ও চানহুদারো থেকে পাওয়া প্রত্নবস্তু ভারত ও পাকিস্তান সমানভাবে ভাগ করে নেবে।
প্রথমদিকে পাকিস্তান ‘ডান্সিং গার্ল’ এবং ‘প্রিস্ট কিং’—দুইটি বিখ্যাত মূর্তিই চাইছিল। কিন্তু ভারত কেবল একটি দিতে রাজি হয়।
আশীষ কুমারের মতে, পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের ধারণা ছিল, নগ্ন ডান্সিং গার্ল তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এটি মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে।
ফলে ‘প্রিস্ট কিং’ পাকিস্তানে চলে গেলেও ডান্সিং গার্ল থেকে যায় দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ামে।
তবে মূর্তিটি পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি থেমে যায়নি। ২০১৬ সালে জাভেদ ইকবাল জাফরি নামের এক ব্যক্তি লাহোর হাইকোর্টে এ বিষয়ে একটি রিট আবেদনও করেন।
ভারতেও ‘শালীন’ করে তোলার চেষ্টা
২০২৩ সালে ভারতে আয়োজিত আন্তর্জাতিক মিউজিয়াম এক্সপোর ম্যাসকট হিসেবে নির্বাচন করা হয় ডান্সিং গার্লকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যখন এর একটি প্রতিরূপ উন্মোচন করেন, তখনও তা বিতর্কের জন্ম দেয়।
কারণ, ওই প্রতিরূপটিকে গোলাপি রঙের ব্লাউজের মতো পোশাক এবং নিচে গুজরাতি নকশা সম্বলিত হলুদ ধুতিসদৃশ পোশাক পরানো হয়েছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে একে ডান্সিং গার্লকে ‘শালীন’ করে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে আখ্যা দেন।
যদিও ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ব্যাখ্যা দেয়, আসল মূর্তিতে কোনো পোশাক পরানো হয়নি। বরং ম্যাসকট হিসেবে উপস্থাপনের সুবিধার্থে প্রতিরূপটিকে এমনভাবে সাজানো হয়েছিল।
এর আগে ২০১৭ সালেও বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি হিন্দি প্রবন্ধকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
‘বৈদিক সভ্যতা কা পুরাতত্ত্ব’ শীর্ষক ওই প্রবন্ধে অবসরপ্রাপ্ত এক গবেষক ডান্সিং গার্লকে দেবী পার্বতীর রূপ বলে উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, মূর্তিটির হাতের ভঙ্গি আসলে কলস ধারণের ভঙ্গি এবং তা দেবীর ‘অক্ষয় পাত্র’-এর প্রতীক।
এই ব্যাখ্যা নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা দেয়। কারণ, কোনো স্বীকৃত গবেষক বা ইতিহাসবিদ কখনও এই মূর্তিকে বৈদিক সভ্যতা কিংবা হিন্দু দেবদেবীর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেননি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ডান্সিং গার্ল?
মূর্তিটির ভঙ্গিমার কারণে একে ‘ডান্সিং গার্ল’ নাম দেওয়া হয়েছিল। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদই মনে করেন, এটি আদৌ নৃত্যরত কোনো নারীর মূর্তি নয়।
একইভাবে ‘প্রিস্ট কিং’ নামটিও কেবল প্রচলিত নাম। কারণ, হরপ্পা সভ্যতায় রাজা, পুরোহিত-শাসক বা কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অস্তিত্বের কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি তাদের ধর্মীয় অনুশীলন সম্পর্কেও নিশ্চিত তথ্য অজানা।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত গবেষক ড. সাঙ্গারালিঙ্গম রমেশ বিবিসিকে বলেন, ‘প্রত্নতত্ত্ববিদ ও নৃতত্ত্ববিদরা এখন পর্যন্ত কোনো রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার চিহ্ন খুঁজে পাননি। ধারণা করা হয়, নগরসমিতির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। রাজপ্রাসাদ বা অভিজাত শ্রেণির উপস্থিতিরও কোনো প্রমাণ নেই’।
ঐতিহাসিক গ্রেগরি এল. পোসেহল তার বই The Indus Civilization-এ প্রথম প্রশ্ন তোলেন যে মূর্তিটি সত্যিই নৃত্যরত কি না। পরে ইতিহাসবিদ উপিন্দর সিংও একই মত প্রকাশ করেন।
তার বই History of Ancient and Early Medieval India-তে তিনি লিখেছেন, “মেয়েটি সম্ভবত নাচছে না। আর যদি নাচেও, তাকে পেশাদার নৃত্যশিল্পীর মতো মনে হয় না।”
ইতিহাসবিদ আশীষ কুমারও এই মতকে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন, ব্রিটিশ কর্মকর্তারা ভারতীয় নারী নর্তকীদের ‘নচ গার্ল’ নামে ডাকতেন এবং এই শব্দটি সম্ভবত ‘নাচ’ শব্দ থেকেই এসেছে।
যে সময়ে সিন্ধু সভ্যতার নগরীগুলোতে খননকাজ চলছিল, তখন এএসআইয়ের মহাপরিচালক ছিলেন স্যার জন মার্শাল।
আশীষ কুমারের মতে, মার্শালও মূর্তিটিকে দেবদাসী প্রথার প্রেক্ষাপটে দেখেছিলেন।
২০১৬ সালে লাহোর হাইকোর্টে মূর্তিটি ফেরত চেয়ে মামলা করা জাভেদ ইকবাল জাফরি তার আবেদনে লিখেছিলেন, ‘পাকিস্তানের জন্য ডান্সিং গার্লের গুরুত্ব ঠিক ততটাই, যতটা ইউরোপের জন্য লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মোনালিসার’।
অন্যদিকে মহারাষ্ট্রের পুনেতে অবস্থিত ডেকান কলেজের উপাচার্য বসন্ত শিন্দের মতে, ‘হরপ্পা সভ্যতার প্রত্নসম্পদ কোনো একটি দেশের একক সম্পত্তি নয়; সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াই এই সভ্যতার উত্তরাধিকার বহন করে’।



