বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬
জীবনযাপন

ওজন কমাতে শুধু ডায়েট নয়, গুরুত্বপূর্ণ খাবার খাওয়ার সময়ও

WhatsApp Image 2026-08-06 at 4.16.09 PM

ওজন কমানো বা শরীরের অতিরিক্ত মেদ ঝরানোর ক্ষেত্রে সাধারণত কী খাওয়া হচ্ছে এবং কত ক্যালরি গ্রহণ করা হচ্ছে, সেদিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান ও ক্রোনোবায়োলজির বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু খাবারের ধরন নয়, কখন খাবার খাওয়া হচ্ছে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই ধারণার ভিত্তিতেই বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘সারকাডিয়ান ফাস্টিং’ বা জৈবিক ঘড়ি অনুযায়ী উপবাসের পদ্ধতি। এর মূল লক্ষ্য হলো শরীরের স্বাভাবিক ২৪ ঘণ্টার জৈবিক ছন্দ বা সারকাডিয়ান রিদমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা। এ পদ্ধতিতে সূর্যাস্তের আগেই রাতের খাবার শেষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে রাতভর শরীর বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পায়।

নোবেলজয়ী গবেষণায় মিলেছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি

২০১৭ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী মার্কিন বিজ্ঞানী জেফ্রি সি. হল, মাইকেল রসব্যাশ এবং মাইকেল ডব্লিউ. ইয়ংয়ের গবেষণায় উঠে আসে, মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষে একটি অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি কাজ করে। সূর্যের আলো ও অন্ধকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই ঘড়ি শরীরের নানা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সাল্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিক্যাল স্টাডিজের অধ্যাপক ও ক্রোনোনিউট্রিশন গবেষক ডা. সাচিন পান্ডার গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের আলোতে শরীরের বিপাকক্রিয়া সবচেয়ে সক্রিয় থাকে। সূর্যাস্তের পর সেই কার্যক্রম ধীরে ধীরে কমে যায়।

Advertisements

তার মতে, রাত ৯টা বা ১০টার পর ভারী খাবার খেলে শরীর তা দক্ষতার সঙ্গে হজম করতে পারে না। এর ফলে ইনসুলিনের ভারসাম্য ব্যাহত হয় এবং অতিরিক্ত গ্লুকোজ পেটের গভীরে জমা হওয়া ‘ভিসেরাল ফ্যাট’-এ রূপ নিতে পারে।

সারকাডিয়ান ফাস্টিংয়ের সম্ভাব্য উপকারিতা

চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী সেল মেটাবলিজম-এ প্রকাশিত ডা. সাচিন পান্ডা ও তার সহকর্মীদের মানবদেহে পরিচালিত ক্লিনিক্যাল গবেষণায় সারকাডিয়ান ফাস্টিংয়ের বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত সুফলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি:
সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে রাতের খাবার শেষ করলে অগ্ন্যাশয় পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায়। এতে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়তে পারে, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং অতিরিক্ত ওজন কমাতে সহায়ক হতে পারে।

অটোফেজি প্রক্রিয়া সক্রিয় হওয়া:
সাধারণত এই খাদ্যাভ্যাসে প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা উপবাসের সময় তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, টানা ১২ ঘণ্টা উপবাসের পর শরীরের কোষগুলো জমে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত কোষ, টক্সিন ও অপ্রয়োজনীয় উপাদান অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ প্রক্রিয়াকে ‘অটোফেজি’ বলা হয়।

ভালো ঘুম ও হৃদ্‌স্বাস্থ্যের উন্নতি:
ঘুমানোর অন্তত তিন থেকে চার ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করলে পরিপাকতন্ত্রের ওপর চাপ কমে। এতে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত স্বাভাবিক হয় এবং ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় ‘মেলাটোনিন’ হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে। ফলে গভীর ঘুমের পাশাপাশি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও কমতে পারে।

কীভাবে অনুসরণ করবেন এই খাদ্যাভ্যাস

বিশেষজ্ঞরা সারকাডিয়ান ফাস্টিং অনুসরণে কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।

  • প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে সর্বোচ্চ ৭টা ৩০ মিনিটের মধ্যে রাতের খাবার শেষ করার চেষ্টা করতে হবে। এরপর ভারী খাবার, নাস্তা বা চা-কফি এড়িয়ে চলাই ভালো।
  • রাতের খাবারের পর থেকে সকালের নাস্তা পর্যন্ত ক্যালরিযুক্ত কোনো খাবার গ্রহণ না করে শুধু পর্যাপ্ত পানি পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
  • পরদিন সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে সুষম নাস্তা করা উচিত। সকালের খাবারে ওটস বা লাল আটার রুটির মতো জটিল শর্করা, ডিম বা ডালের মতো প্রোটিন এবং অলিভ অয়েলের মতো স্বাস্থ্যকর চর্বি রাখলে সারাদিন বিপাকক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুললে ওজন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সামগ্রিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

Advertisements
ওজনজৈবিক ঘড়িস্বাস্থ্য