বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ২২ জুন, ২০২৬
বিবিধ

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় নিরাপদ স্কুল যাত্রা, আস্থা জাগাচ্ছে ‘পিউপিল স্কুল বাস’

School-bus-3 (1)

ব্যস্ত নগরজীবনে সন্তানকে নিরাপদে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া এবং ফেরত আনা অনেক অভিভাবকের জন্য প্রতিদিনের বড় উদ্বেগ। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো জনবহুল শহরে যানজট, সড়ক নিরাপত্তাহীনতা এবং অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থার কারণে এই দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে যায়। এমন বাস্তবতায় প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপদ স্কুল পরিবহন সেবা নিয়ে কাজ করছে দেশের স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ‘পিউপিল স্কুল বাস লিমিটেড’।

প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে। প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রশিদের ভাষ্য, একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে দীর্ঘ সময় সন্তানের কোনো খোঁজ না পেয়ে তিনি ভীষণ উদ্বেগে পড়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে ভাবতে বাধ্য করে-দেশের অসংখ্য অভিভাবক প্রতিদিন একই ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যান। সেই ভাবনা থেকেই ২০২৩ সালে যাত্রা শুরু করে প্রযুক্তিনির্ভর স্কুল পরিবহন প্ল্যাটফর্ম ‘পিউপিল স্কুল বাস’।

প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য শুধু পরিবহনসেবা দেওয়া নয়; বরং অভিভাবকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ স্কুল যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ কারণে প্রতিটি যানবাহনে যুক্ত করা হয়েছে রিয়েল-টাইম জিপিএস ট্র্যাকিং প্রযুক্তি। ফলে সন্তান কোন অবস্থানে আছে, বাস কোথায় রয়েছে- সব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারেন অভিভাবকেরা।

এ ছাড়া শিক্ষার্থী বাসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর পর অভিভাবকের মোবাইলে স্বয়ংক্রিয় নোটিফিকেশন পৌঁছে যায়। রয়েছে বিশেষ ‘প্যারেন্ট অ্যাপ’, যার মাধ্যমে বাসের অবস্থান পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি লাইভ ওয়েবক্যামের সাহায্যে বাসের ভেতরের পরিস্থিতিও দেখা যায়। প্রযুক্তি ব্যবহারে যেন কোনো অভিভাবক সমস্যায় না পড়েন, সে জন্য অ্যাপটিতে বাংলা ভাষার সুবিধা এবং সহজ ব্যবহারযোগ্য ইন্টারফেস রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি বাসে প্রশিক্ষিত চালকের পাশাপাশি একজন নারী অ্যাটেনডেন্ট দায়িত্ব পালন করেন।

বিটুবি (বিজনেস টু বিজনেস) এবং বিটুসি (বিজনেস টু কনজ্যুমার) মডেলে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে স্কুল ও অভিভাবক- উভয় পর্যায়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। যাত্রা শুরুর পর থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৭ হাজার ২০০-এর বেশি শিক্ষার্থীকে সেবা দিয়েছে তারা। এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী নিয়মিত এই সেবার আওতায় রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ৫৫টিরও বেশি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু নিরাপত্তা নয়, পরিবেশ সুরক্ষাতেও অবদান রাখছে এই উদ্যোগ। কারপুলিংভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থার কারণে বহু অভিভাবক ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে পারছেন। ফলে নগরীর সড়কে যানবাহনের চাপ যেমন কমছে, তেমনি কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পাচ্ছে।

উদ্ভাবনী এই সেবা ইতোমধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। নিরাপদ স্কুল পরিবহন ব্যবস্থায় অবদানের জন্য প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা আবদুর রশিদ ‘নাগরিক পদক ২০২৫’ অর্জন করেছেন। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন এমএসএমই পুরস্কার এবং সরকারি উদ্ভাবন কর্মসূচিতে নির্বাচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পৌঁছে গেছে বাংলাদেশের এই উদ্যোগ। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত ‘প্রফেশনাল ফেলোস প্রোগ্রাম’-এ অংশ নেওয়ার পর আগামী জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্যের টালসা শহরেও পিউপিল স্কুল বাসের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে ৩৫ জন কর্মী কাজ করছেন। তাদের বহরে রয়েছে ৭৫টি যানবাহন, যার মধ্যে ১৩টি দোতলা বাস এবং ৬২টি মাইক্রোবাস।

প্রতিষ্ঠাতা আবদুর রশিদের স্বপ্ন, দেশের সীমানা পেরিয়ে ‘পিউপিল স্কুল বাস’-কে একটি বিশ্বমানের স্কুল পরিবহন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। তাঁর মতে, প্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে ভবিষ্যতে স্কুল পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, কার্যকর ও আধুনিক করে তোলা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নেওয়া এই উদ্যোগ একদিন আন্তর্জাতিক বাজারেও আস্থার প্রতীক হয়ে উঠবে-এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

নিরাপদপিউপিল স্কুল বাসপ্রযুক্তি