শ্রুতিলেখক ইস্যু : অন্ধকারকে হারিয়ে এগিয়েও থমকে যাওয়া শারমিনের লড়াই

যখন অন্য শিশুরা রঙিন পৃথিবী দেখে বড় হয়, তখন শারমিন আক্তার শিখেছেন পৃথিবীকে অনুভব করতে। মানুষের কণ্ঠস্বর, পায়ের শব্দ, বাতাসের গন্ধ কিংবা সাদাছড়ির স্পর্শ- এসবই তাঁর চোখ। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় অন্ধকারও তাঁকে থামাতে পারেনি। থামিয়ে দিয়েছে এক জটিল ব্যবস্থা, যেখানে যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগটুকুও অনেক সময় অধরা থেকে যায়।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কৈখালী ইউনিয়নের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম শারমিনের। চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। ছোটবেলায় ছিলেন দুরন্ত, প্রাণবন্ত। স্কুল শেষে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা আর হৈচৈ করে সময় কাটত। পাশাপাশি পড়াশোনাতেও ছিলেন সমান মনোযোগী। স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। কিন্তু তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় একটি অসুস্থতা বদলে দেয় তাঁর জীবন। সুস্থ হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, আগের মতো দেখতে পাচ্ছেন না। বইয়ের ছোট অক্ষরগুলো ঝাপসা লাগে, হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খান। শুরুতে পরিবার বিষয়টিকে সাময়িক সমস্যা ভেবেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে চোখের দৃষ্টি।
স্থানীয় চিকিৎসক থেকে শুরু করে বড় শহরের বিশেষজ্ঞ, এমনকি ভারতের হাসপাতাল- কোথাও মিলেনি আশার আলো। চিকিৎসকদের ভাষায়, চোখের শিরাগুলো শুকিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারান শারমিন। এই পরিস্থিতি শুধু তাঁর জীবন নয়, নাড়িয়ে দেয় পুরো পরিবারকে। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েন বাবা। পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব এসে পড়ে বড় ভাইয়ের কাঁধে। অনেকের জায়গায় হয়তো সেখানেই থেমে যেত গল্পটি। কিন্তু শারমিন থামেননি।
দুই বছর ঘরবন্দি থাকার পর একদিন বড় ভাইকে বলেছিলেন, “আমি আবার পড়তে চাই।”
সেই ইচ্ছাই তাঁকে ফিরিয়ে আনে শিক্ষাজীবনে। ঢাকার ব্যাপটিস্ট মিশনে ভর্তি হওয়ার পর ব্রেইল শিক্ষার সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। নতুনভাবে বইয়ের জগতে ফিরে আসেন। পরে নিজ গ্রামের স্কুলে ভর্তি হতে গিয়েও বাধার মুখে পড়েন। শিক্ষকেরা সন্দিহান ছিলেন- একজন দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থী কীভাবে পড়াশোনা করবে?

কিন্তু শারমিন হার মানেননি। নিজের সক্ষমতার ওপর ভরসা রেখে সুযোগ চেয়েছিলেন। অবশেষে সেই সুযোগ পেয়েছিলেনও। ফলাফল দিয়ে প্রমাণ করেন, সুযোগ পেলে তিনিও পারেন। এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফল করার পর ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন তাঁর জন্য ছিল নতুন সম্ভাবনার দরজা। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি শুধু নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাননি, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করার স্বপ্নও দেখেছেন। সমমনা কয়েকজনকে নিয়ে গড়ে তোলেন একটি সংগঠন, যার উদ্দেশ্য ছিল প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তা করা।
তবে শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর শুরু হয় আরেক যুদ্ধ- কর্মজীবনের যুদ্ধ।
স্নাতকোত্তর শেষ করে তিনি চাকরির জন্য আবেদন করতে থাকেন। কিন্তু প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রে নতুন নতুন বাধা তাঁর পথ আটকে দেয়। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীর জন্য শ্রুতিলেখক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তাঁকে নিজের পছন্দের শ্রুতিলেখক ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না। ফলে সময়মতো উত্তর লেখা সম্ভব হয় না।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে বাংলাদেশ রেলওয়ের সহকারী স্টেশন মাস্টার নিয়োগ পরীক্ষায়। পরীক্ষার হলে বসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই শ্রুতিলেখক নিয়ে আপত্তি তুলে তাঁকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন শারমিন। বহুদিনের প্রস্তুতি, স্বপ্ন আর প্রত্যাশা মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে। সেদিন তাঁর চোখে ছিল কান্না, কিন্তু সেই কান্না শুধুই ব্যক্তিগত বেদনার ছিল না। সেটি ছিল এমন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এখনও সমান সুযোগ পাওয়ার জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন।
শারমিনের গল্প কোনো করুণ কাহিনি নয়। এটি এক সংগ্রামী নারীর গল্প, যিনি আলো হারিয়েও স্বপ্ন হারাননি। যিনি বারবার প্রমাণ করেছেন, প্রতিবন্ধকতা মানুষের সামর্থ্য কেড়ে নিতে পারে না। প্রয়োজন শুধু একটি ন্যায়সংগত সুযোগ। আজও তিনি চাকরির আশায় আবেদন করে চলেছেন। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চান, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান। তাঁর দাবি খুব বড় কিছু নয়- তিনি দয়া চান না, করুণা চান না। তিনি চান সমান সুযোগ। আর সেই সুযোগের অপেক্ষাতেই রয়েছেন শারমিন আক্তার- অন্ধকারকে হারিয়ে আলো খোঁজার এক অনন্য প্রতীক।



