৮ ঘণ্টা ঘুম: স্বাস্থ্যবিধি নাকি ম্যাট্রেস কোম্পানির ব্যবসায়িক কৌশল?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই এমন কিছু তথ্য চোখে পড়ে, যা প্রথম দেখায় অবিশ্বাস্য মনে হলেও পরে কৌতূহল তৈরি করে। সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে, মানুষের দিনে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর যে ধারণা আমরা এত দিন ধরে বিশ্বাস করে এসেছি, সেটি নাকি আদৌ বৈজ্ঞানিক কোনো নিয়ম নয়। বরং ১৯৩৮ সালে একটি ম্যাট্রেস কোম্পানি নিজেদের ব্যবসা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এই ধারণা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিল।

পোস্টটিতে আরও বলা হয়েছে, আগে মানুষ কখনোই টানা ৮ ঘণ্টা ঘুমাত না। তারা রাতে চার ঘণ্টা ঘুমিয়ে মাঝরাতে জেগে উঠত, কিছু সময় বিভিন্ন কাজে ব্যয় করত, তারপর আবার চার ঘণ্টা ঘুমাত। মাঝরাতের সেই সময়টিকে ‘গড আওয়ার্স’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি শেক্সপিয়ার ও মোৎজার্টের মতো কিংবদন্তি স্রষ্টারাও নাকি তাদের সেরা কাজগুলো ওই সময়েই করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কি এত দিন ধরে চিকিৎসক, গবেষক ও স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা যে ৮ ঘণ্টা ঘুমের কথা বলে আসছেন, সেটি আসলে একটি কোম্পানির সফল বিপণন কৌশল?
তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। ৮ ঘণ্টা বিশ্রামের ধারণা আসলে ম্যাট্রেস কোম্পানির অফিসে নয়, জন্ম নিয়েছিল শিল্পবিপ্লবের সময় শ্রমিকদের অধিকার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। উনিশ শতকের শুরুতে কারখানার শ্রমিকদের দিনে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হতো। এই অমানবিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন সমাজসংস্কারক রবার্ট ওয়েন। ১৮১৭ সালে তিনি ‘৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিনোদন এবং ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম’—এই স্লোগান সামনে আনেন। পরবর্তীকালে এই বিশ্রামের ধারণার সঙ্গেই ঘুমের বিষয়টি যুক্ত হয়ে যায়।

তবে ভাইরাল পোস্টের সব কথাই যে ভুল, তা-ও নয়। ইতিহাসবিদ রজার একিরচের গবেষণায় দেখা যায়, বিদ্যুৎ আবিষ্কারের আগে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ সত্যিই দুই ধাপে ঘুমানোর অভ্যাসে অভ্যস্ত ছিল। সন্ধ্যার কিছু পর প্রথম ঘুমে যাওয়া, মাঝরাতে এক থেকে দুই ঘণ্টা জেগে থাকা এবং পরে আবার ঘুমিয়ে পড়া—এমন রুটিন অনেক সমাজেই দেখা যেত। কিন্তু এটিই ছিল মানুষের একমাত্র বা আদর্শ ঘুমের পদ্ধতি—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। সময়, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের ঘুমের ধরনও বদলেছে।
ভাইরাল পোস্টে শেক্সপিয়ার ও মোৎজার্টের প্রসঙ্গও এসেছে। দাবি করা হয়েছে, তারা নাকি মাঝরাতের ওই ‘গড আওয়ার্সে’ তাদের সেরা সৃষ্টি উপহার দিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাস ঘেঁটে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। বরং বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আকর্ষণীয় কিন্তু ভিত্তিহীন একটি গল্প।
আরও একটি দাবি করা হয়েছে যে, আধুনিক ঘুমবিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ ড. নাথানিয়েল ক্লিটম্যান নাকি ম্যাট্রেস কোম্পানির অর্থে ভুয়া গবেষণা করেছিলেন। বাস্তবতা হলো, ক্লিটম্যানকে আধুনিক ঘুম গবেষণার জনক বলা হয়। মানুষের ঘুম, জৈবিক ঘড়ি এবং ঘুমের বিভিন্ন ধাপ নিয়ে তার গবেষণা আজও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ১৯৩৮ সালে তিনি ম্যামথ গুহায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করে মানবদেহের সার্কাডিয়ান রিদম নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন। তার কাজকে কোনো কোম্পানির সাজানো গবেষণা বলার মতো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
মজার ব্যাপার হলো, ভাইরাল পোস্টের শেষের দিকের একটি কথা আবার পুরোপুরি সত্য। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে, হরমোনের ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে এবং শরীরে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও এ বিষয়গুলো স্বীকার করে।

সব মিলিয়ে দেখা যায়, ভাইরাল পোস্টটি কিছু ঐতিহাসিক সত্য, কিছু আংশিক সত্য এবং কিছু সম্পূর্ণ ভুল তথ্যকে একসঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ফলে বিষয়টি প্রথম দেখায় বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেও পুরো ছবিটা ভিন্ন।
তাই ৮ ঘণ্টা ঘুমের নিয়মকে কোনো ম্যাট্রেস কোম্পানির বিজনেস স্ট্র্যাটেজি বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আবার এটাও সত্য যে প্রত্যেক মানুষের ঘুমের প্রয়োজন এক নয়। কারও ৭ ঘণ্টা যথেষ্ট, কারও ৮ ঘণ্টা, আবার কারও আরও বেশি সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘুম থেকে ওঠার পর শরীর ও মন কতটা সতেজ অনুভব করছে।
ইন্টারনেটের ভাইরাল দাবির চেয়ে নিজের শরীরের চাহিদা এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর ভরসা করাই তাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
তথ্যসুত্রঃ প্রথম আলো



