বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬
বিশ্লেষণ

কালো রেশমে লেখা পবিত্রতার গল্প: কাবার গিলাফের ইতিহাস

beautiful-kaaba

পবিত্র কাবা শরিফ মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে পবিত্র স্থান। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান প্রতিদিন নামাজে এই ঘরের দিকেই মুখ করে দাঁড়ান। ইসলামের এই কেন্দ্রবিন্দুকে আবৃত করে রাখা কালো রঙের সুদৃশ্য আবরণটি পরিচিত ‘কিসওয়া’ বা ‘গিলাফ’ নামে। প্রতি বছর নতুন গিলাফে সজ্জিত করা হয় কাবা শরিফকে। এটি শুধু একটি কাপড় নয়; বরং ইসলামী ঐতিহ্য, শিল্পকলা, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার এক অসাধারণ প্রতীক।

গিলাফের ইতিহাস কত পুরোনো?

ইতিহাসবিদদের মতে, কাবা শরিফকে কাপড়ে আবৃত করার রীতি ইসলামেরও পূর্ববর্তী। আরবের বিভিন্ন গোত্র কাবাকে সম্মান জানাতে বিভিন্ন ধরনের কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখত। ইসলামের আবির্ভাবের পর মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এই ঐতিহ্য বহাল রাখেন এবং পরবর্তী খলিফারাও তা অনুসরণ করেন।

খলিফা উমর (রা.)-এর সময় মিসরে তৈরি বিশেষ সাদা লিনেন কাপড়ের গিলাফ কাবায় পাঠানো হতো। পরবর্তীতে উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমলে রেশমি গিলাফ ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়। আব্বাসীয় খলিফা আল-মাহদি প্রথম পুরোনো গিলাফ সরিয়ে প্রতিবছর নতুন গিলাফ পরানোর ব্যবস্থা করেন। কারণ বছরের পর বছর গিলাফ জমে কাবার ওপর অতিরিক্ত ওজন সৃষ্টি হচ্ছিল।

দীর্ঘ শতাব্দী ধরে মিসরে কাবার গিলাফ তৈরি হতো। ১৯২৭ সালে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজ মক্কায় প্রথম কিসওয়া কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে ‘কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্স ফর দ্য হোলি কাবা কিসওয়া’ নামের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর নতুন গিলাফ তৈরি করে।

কী দিয়ে তৈরি হয় কিসওয়া?

বর্তমান কিসওয়া মূলত কালো রঙে রঞ্জিত প্রাকৃতিক রেশম দিয়ে তৈরি করা হয়। এর ওপর সোনা ও রুপার প্রলেপযুক্ত সুতা ব্যবহার করে কুরআনের আয়াত, শাহাদাতের বাণী এবং বিভিন্ন ইসলামিক অলংকরণ সূচিকর্মের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়।

একটি পূর্ণাঙ্গ কিসওয়া তৈরিতে ব্যবহৃত হয় প্রায় ৪৭টি বড় রেশমি কাপড়ের প্যানেল। পুরো গিলাফের আয়তন প্রায় ৬৫৮ বর্গমিটার। এতে শত শত কিলোগ্রাম রেশম, সোনা ও রুপার প্রলেপযুক্ত সুতা ব্যবহৃত হয়।

যেভাবে তৈরি হয় কাবার গিলাফ

একটি কিসওয়া প্রস্তুত করতে প্রায় ১০ থেকে ১১ মাস সময় লাগে। পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়।

প্রথমে বিশেষভাবে পরিশোধিত পানির সাহায্যে রেশম প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরপর রেশম সুতাকে কালো রঙে রঞ্জিত করা হয়। সেই সুতা অত্যাধুনিক তাঁতে বুনে বড় বড় কাপড়ে রূপ দেওয়া হয়।

এরপর কাপড়ের ওপর কুরআনের আয়াত ও ইসলামিক নকশার নকশা অঙ্কন করা হয়। দক্ষ কারিগররা সোনা ও রুপার প্রলেপযুক্ত সুতা দিয়ে হাতে হাতে সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারির কাজ সম্পন্ন করেন। পরে বিভিন্ন অংশ সেলাই করে একটি পূর্ণাঙ্গ গিলাফ তৈরি করা হয়। সর্বশেষ ধাপে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়।

গিলাফের বিভিন্ন অংশ

কাবার গিলাফের সবচেয়ে পরিচিত অংশ হলো কালো রেশমি আবরণ। এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ উচ্চতায় থাকে সোনালি ও রুপালি সূচিকর্মে তৈরি বিখ্যাত বেল্ট, যা ‘হিজাম’ নামে পরিচিত। এই বেল্টে কুরআনের আয়াত খচিত থাকে।

এ ছাড়া কাবার দরজার ওপর ঝুলানো বিশেষ পর্দাকে বলা হয় ‘সিতারা’। এটি গিলাফের সবচেয়ে অলংকৃত অংশগুলোর একটি এবং এতে অত্যন্ত নিখুঁত কারুকাজ করা হয়।

কখন পরিবর্তন করা হয় গিলাফ?

বর্তমানে প্রতি হিজরি বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ মহররমে কাবার গিলাফ পরিবর্তন করা হয়। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কারিগরদের একটি দল অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পুরোনো গিলাফ অপসারণ করে নতুন গিলাফ স্থাপন করেন।

পরিবর্তনের পর পুরোনো গিলাফ সাধারণত বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করা হয়। পরে এগুলো উপহার, প্রদর্শনী কিংবা সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হয়।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ কাবার গিলাফ?

কাবার গিলাফ মুসলিমদের কাছে কেবল একটি কাপড় নয়; এটি সম্মান, ভালোবাসা ও পবিত্রতার প্রতীক। ইসলামের ইতিহাস, শিল্পকলা ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে কিসওয়া বিশেষ মর্যাদা বহন করে।

প্রতি বছর নতুন গিলাফে সজ্জিত কাবা শরিফের দৃশ্য বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেন। নতুন কিসওয়া যেন মুসলিম উম্মাহকে স্মরণ করিয়ে দেয় পবিত্রতা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর ঘরের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার কথা।

ইতিহাসকাবাকিসওয়াগিলাফমহররম