বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ৩০ মে, ২০২৬
বিবিধ

স্ত্রী হ’ত্যার বিচার পেতে ২৬ বছর ভাড়া গুনেছেন র’ক্তমাখা শূন্য ঘরের

WhatsApp Image 2026-05-30 at 9.02.05 AM

১৯৯৯ সাল। জাপানের নাগোয়া শহরের একটি ভাড়াবাড়িতে নির্মমভাবে খুন হন নামিকো তাকাবা। সেই সময় বাড়িতে ছিলেন না তার স্বামী সাতোরু তাকাবা। তবে উপস্থিত ছিল তাঁদের ছোট সন্তান। ভয়াবহ সেই ঘটনায় নামিকোর শরীরে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেলেও শিশুটির গায়ে কোনো আঘাত ছিল না।

ঘটনার পর থেকেই সন্দেহ ও প্রশ্নে ভরে ওঠে সাতোরুর জীবন। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, এটি কোনো এলোমেলো ঘটনা নয়, বরং পরিচিত কারও কাজ। কিন্তু তদন্তে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা শক্ত প্রমাণ না থাকায় মামলাটি ধীরে ধীরে থমকে যায়। সে সময় ফরেনসিক প্রযুক্তিও উন্নত ছিল না, ফলে ডিএনএ বিশ্লেষণের মতো আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

কিন্তু সাতোরু সেই থেমে যাওয়াকে মেনে নিতে পারেননি। তাঁর কাছে এটি শুধু একটি অপরাধ ছিল না-এটা ছিল অসমাপ্ত সত্য। তাঁর সন্দেহ ছিল, এটি কোনো অপরিচিত অপরাধী নয়, বরং পরিচিত কারও কাজ। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তিনি লড়বেন-যত বছরই লাগুক।

স্ত্রী হত্যার পর তিনি সন্তানকে নিয়ে অন্য জায়গায় চলে যান। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই পুরনো ভাড়াবাড়ি তিনি পুরোপুরি ছাড়েন না। বরং প্রতি মাসে নিয়ম করে ভাড়া দিয়ে যান। বছর যায়, দশক যায়-২৬ বছর ধরে একটিও মাস বাদ যায় না।

বাড়িটি সিল করে রাখা হয়েছিল পুলিশের পক্ষ থেকে। অপরাধস্থল অপরিবর্তিত ছিল-রক্তের দাগ, ঘরের জিনিসপত্র, এমনকি হত্যার সময়ের চিহ্ন পর্যন্ত অক্ষত রাখা হয়। সময় যেন সেখানে থমকে ছিল। সাতোরু অন্য একটি বাড়িতে থাকলেও প্রতিটি মাসে তিনি সেই পুরনো বাড়ির ভাড়া দিয়ে যেতেন শুধুমাত্র এই বিশ্বাস থেকে যে প্রমাণ একদিন পাওয়া যাবে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জাপানে ফরেনসিক বিজ্ঞান উন্নত হয়। ২০১০ সালের পর ডিএনএ পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ে, আর ২০২০-এর পর তা আরও আধুনিক হয়ে ওঠে। তখনই পুরনো অনেক অমীমাংসিত মামলার ফাইল আবার খোলা হয়। নামিকোর হত্যার মামলাও সেই তালিকায় আসে। তদন্তকারীরা আবার সেই পুরনো ভাড়াবাড়িতে ফিরে যান। এত বছর পরও ঘরটি প্রায় আগের মতোই ছিল—যেন অপেক্ষা করছিল। সেখান থেকে আবার নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

নতুন পরীক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিএনএ পাওয়া যায়, যা নামিকো বা তার পরিবারের কারও সঙ্গে মেলে না। এই সূত্র ধরে সন্দেহের পরিধি বাড়ে। একসময় তদন্ত গড়ায় কুমিকো ইয়াসুফুকুর দিকে-যিনি ছিলেন সাতোরুর শৈশবের পরিচিত।

ইয়াসুফুকু আগে একাধিকবার পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হলেও তিনি কখনোই ডিএনএ পরীক্ষার জন্য রক্ত দিতে রাজি হননি। পরে আধুনিক ডিএনএ পরীক্ষায় ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া রক্তের নমুনার সঙ্গে তার ডিএনএ মিলে যায়। এরপরই তাকে হত্যার সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে ইয়াসুফুকু বলেন, ‘গত দুই দশক ধরে আমি প্রতিদিনই ভয়ে ছিলাম। এই মামলার খবরও আমি দেখতে পারতাম না। প্রতি বছর ১৩ নভেম্বর এলেই আমার খুব দুশ্চিন্তা হতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি গ্রেপ্তার হতে চাইনি, কারণ এতে আমার পরিবারের সমস্যা হবে ভেবেছিলাম। কিন্তু আগস্টে পুলিশ যোগাযোগ করার পর আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে যাই। আমি নামিকোর কাছে ক্ষমা চাইতে চাই।’

অন্যদিকে সাতোরু তাকাবা বলেন, সন্দেহভাজনের নাম শুনে তিনি অবাক হয়ে যান। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো ভাবিনি সে-ই খুনি হতে পারে। আমার ধারণা ছিল, অপরাধী হয়তো শহর ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু পরে জানতে পারি, সে আমার ভাড়াবাড়ির কাছেই এত বছর ধরে ছিল।’

তদন্তে জানা যায়, ইয়াসুফুকু এবং সাতোরু একই স্কুলে পড়তেন। তখন ইয়াসুফুকুর তার প্রতি একতরফা ভালো লাগা ছিল। একবার ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে তিনি চকলেট ও চিঠিও পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু সাতোরু তা প্রত্যাখ্যান করেন। স্কুল শেষ হওয়ার পর তাদের আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। ঘটনার এক বছর আগে তারা একবার মাত্র দেখা করেন।

সাতোরুর মতে, সেই সময় ইয়াসুফুকু বলেছিলেন তিনি বিবাহিত এবং কাজের চাপে ক্লান্ত। তাই তিনি তখন তাকে নিয়ে সন্দেহ করেননি। প্রতিবেশীরা পুলিশকে জানিয়েছেন, ঘটনার আগে ভুক্তভোগীর বাড়ি থেকে প্রায়ই ঝগড়ার শব্দ শোনা যেত।

২৬ বছরের এই দীর্ঘ সময়ে সাতোরু সেই ঘরের ভাড়া বাবদ প্রায় ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ডলার খরচ করেন। অনেকেই তাঁর এই কাজকে অস্বাভাবিক মনে করেছিলেন, কেউ কেউ অন্ধ বিশ্বাস বলেও ভেবেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বিশ্বাসই সত্যের দরজা খুলে দেয়।

২৬ বছরনামিকো তাকাবাপুলিশসাতোরুস্ত্রী