একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে গাছের প্রজাতি, সামনে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পরিচিত বহু উদ্ভিদ প্রজাতি চলতি শতাব্দীর মধ্যেই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যেহেতু তাদের টিকে থাকার উপযোগী পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আবাসস্থলের পরিসরও সংকুচিত হয়ে আসছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় এমন আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন গবেষকরা। তাদের মতে, উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের এই ক্ষতি শুধু প্রকৃতির জন্যই নয়, মানুষের জীবন ও পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বিপুলসংখ্যক ভাসকুলার প্ল্যান্ট বা সংবহনকলাযুক্ত উদ্ভিদের ভবিষ্যৎ বিস্তৃতি ও আবাসস্থল নিয়ে একটি মডেল তৈরি করেছেন। এসব উদ্ভিদের দেহে পানি ও পুষ্টি পরিবহনের জন্য বিশেষ ধরনের টিস্যু বা কলা থাকে। পৃথিবীর অধিকাংশ উদ্ভিদই এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। গবেষণায় ৬৭ হাজারের বেশি প্রজাতির উদ্ভিদ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটি বিশ্বের পরিচিত ভাসকুলার উদ্ভিদের প্রায় ১৮ শতাংশ।
গবেষণায় দেখা গেছে, চলতি শতাব্দীর শেষের দিকে ৭ থেকে ১৬ শতাংশ প্রজাতির উদ্ভিদ তাদের বর্তমান বিচরণক্ষেত্রের ৯০ শতাংশের বেশি হারিয়ে ফেলতে পারে। এতে এসব উদ্ভিদ বিলুপ্তির উচ্চঝুঁকিতে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টডক্টরাল গবেষক জুনা ওয়াং এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক শিয়াওলি দং বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, বিষয়টি বোঝার জন্য উদ্ভিদগুলোকে একটি চলমান ‘জলবায়ুবলয়’ অনুসরণকারী হিসেবে কল্পনা করা যেতে পারে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক উদ্ভিদ প্রজাতি তুলনামূলক শীতল পরিবেশের খোঁজে উত্তরাঞ্চল বা পাহাড়ি উঁচু এলাকায় সরে যেতে পারে। তবে গবেষকদের মতে, শুধু তাপমাত্রাই এখানে নির্ধারক নয়; এটি পুরো পরিস্থিতির কেবল একটি অংশমাত্র।

তাদের এ গবেষণাটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক বিখ্যাত সাময়িকী ‘সায়েন্সে’।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অনেক অঞ্চলে উদ্ভিদের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশগত উপাদানগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে এমন এলাকার সংখ্যা কমে আসছে, যেখানে কোনো উদ্ভিদ প্রজাতির বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সব শর্ত একসঙ্গে বিদ্যমান থাকে।
গবেষকদের মতে, উদ্ভিদের বিচরণক্ষেত্র স্বাভাবিকভাবে খুব ধীরগতিতে বিস্তৃত। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়তে দীর্ঘ সময় লাগে। সাধারণত বাতাস, পানি, প্রাণী কিংবা অভিকর্ষ বলের মাধ্যমে বীজ ও রেণু ছড়িয়ে পড়ে নতুন এলাকায়।
তবে গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো উদ্ভিদ নতুন উপযোগী পরিবেশে পৌঁছাতে পারলেও তা সব সময় বিলুপ্তির ঝুঁকি এড়াতে পারে না। কারণ, নতুন এলাকাতেও অনেক ক্ষেত্রে ওই প্রজাতির বিলুপ্তির আশঙ্কা প্রায় একই মাত্রায় থেকে যায়।
ওয়াং ও দং বলেন, উদ্ভিদের ধীরগতির বিস্তারই যদি মূল সমস্যা হতো, তাহলে নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ দিলে বিলুপ্তির ঝুঁকি অনেক কমে যেত। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু স্থানান্তর করলেই সমাধান হচ্ছে না, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনেক জায়গাতেই উপযোগী আবাসস্থল দ্রুত কমে যাচ্ছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের সব অঞ্চলে একই ধরনের প্রভাব পড়বে না। কোথাও শীতনির্ভর উদ্ভিদ আবাসস্থল হারাবে, আবার কোথাও খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়বে। তবে কিছু অঞ্চলে নতুন উদ্ভিদ প্রজাতির বিস্তারের কারণে স্থানীয় বৈচিত্র্য বাড়তেও পারে।
গবেষকদের ভাষ্যমতে, উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের এই পরিবর্তন প্রকৃতি ও মানুষের জন্য বড় প্রভাব ফেলতে পারে যেহেতু উদ্ভিদ কার্বন শোষণ, মাটির স্থিতি রক্ষা এবং খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উদ্ভিদের আচ্ছাদন কমে গেলে বৈশ্বিক উষ্ণতাও আরও বাড়তে পারে।



