বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ২৩ মে, ২০২৬
বিনোদন

শাবানাকে নিয়ে ববিতার স্মৃতিচারণ

WhatsApp Image 2026-05-23 at 6.42.21 PM

বাংলা চলচ্চিত্রের দুই কিংবদন্তি অভিনেত্রী শাবানা ও ববিতা—একসময় দর্শকের কাছে ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। পর্দায় তাদের উপস্থিতি যেমন আলোচনার জন্ম দিত, তেমনি ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও নানা গুঞ্জন ছিল চলচ্চিত্র অঙ্গনে। তবে সেই সব জল্পনাকে ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছেন ববিতা। তাঁর ভাষায়, শাবানার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল গভীর শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বের।

সম্প্রতি ববিতা বলেন, শাবানা তার আগেই চলচ্চিত্রে এসেছিলেন। ১৯৬৭ সালে এহতেশামের ‘চকোরী’ সিনেমার মাধ্যমে শাবানার অভিষেক হয়। অন্যদিকে ববিতা নায়িকা হিসেবে কাজ শুরু করেন ১৯৬৯ সালে জহির রায়হানের ‘শেষ পর্যন্ত’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) প্রথমবারের মতো তাদের পরিচয় হয় বলে জানান ববিতা। তখন তিনি সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায় অভিনয় করে দেশে ফিরেছেন। এফডিসিতে আয়োজিত সংবর্ধনায় শাবানা তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। সেই প্রথম দেখাতেই শাবানার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন বলে জানান তিনি।

ববিতা বলেন, দর্শক অনেক সময় তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবলেও বাস্তবে তারা একে অপরের কাজকে সম্মান করতেন। ধীরে ধীরে সম্পর্ক আরও গভীর হয় এবং একসঙ্গে একাধিক সিনেমায় অভিনয় করেন তারা। ১৯৭৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সাইফুল আজম কাশেম পরিচালিত ‘সোহাগ’ ছিল তাদের প্রথম একসঙ্গে কাজ করা সিনেমা। এরপর ‘কাপুরুষ’, ‘ফকির মজনু শাহ’, ‘বারুদ’ ও ‘সোনার হরিণ’ সিনেমাতেও জুটি বাঁধেন দুই তারকা।

শাবানার পেশাদারিত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ববিতা। তার মতে, শুটিং ফ্লোরে সব সময় সময়মতো উপস্থিত থাকতেন শাবানা। সংলাপ মুখস্থ রাখা থেকে শুরু করে চরিত্রের প্রস্তুতি—সবকিছুই নিখুঁতভাবে করতেন তিনি। বিশেষ করে আবেগঘন দৃশ্যে শাবানার অভিনয় তাকে মুগ্ধ করত।

ববিতার ভাষায়, শাবানার অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার চোখের ভাষা। সংলাপ ছাড়াই তিনি দৃষ্টির মাধ্যমে আবেগ প্রকাশ করতে পারতেন। ‘ভাত দে’ সিনেমায় শাবানার অভিনয় তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল বলেও জানান তিনি।

অভিনয়ের বাইরেও শাবানার মানবিক দিকের কথা তুলে ধরেন ববিতা। তিনি বলেন, এত জনপ্রিয়তার পরও শাবানার মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। ইউনিটের ছোট কর্মচারী থেকে পরিচালক—সবার সঙ্গে সহজভাবে মিশতেন তিনি।

শুটিংয়ের নানা স্মৃতিও ভাগ করে নিয়েছেন ববিতা। কক্সবাজারে এক শুটিংয়ের সময় শাবানা তার কাছ থেকে পোশাক ও পরচুলা ধার নিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। এসব ছোট ছোট ঘটনাই তাদের সম্পর্কের আন্তরিকতার প্রমাণ বলে মন্তব্য করেন ববিতা।

তিনি আরও জানান, শাবানার প্রথম সন্তান হওয়ার পর হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। একবার কলকাতা থেকে শাবানার জন্য পছন্দের শাড়িও এনে উপহার দিয়েছিলেন।

ববিতা বলেন, তাদের সময়ের চলচ্চিত্র জগৎ ছিল অনেক কষ্টের, তবে ভালোবাসায় ভরা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করলেও সিনেমার প্রতি ভালোবাসাই তাদের এগিয়ে নিয়েছে। আর সেই যাত্রাপথে শাবানা ছিলেন তার অন্যতম সেরা সহযাত্রী।

অনেক বছর পর কলকাতার একটি দোকানে হঠাৎ দেখা হয়েছিল দুই অভিনেত্রীর। সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে ববিতা বলেন, দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়ায় দুজনই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমি বলতে পারি, শাবানা আপা সত্যিই অনন্য একজন। মানুষ হিসেবে, শিল্পী হিসেবে তিনি সব সময় আমার হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে থাকবেন। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যায়, কিন্তু কিছু স্মৃতি কখনও পুরোনো হয় না। শাবানা আপার সঙ্গে কাটানো দিনগুলোও ঠিক তেমনই– আজও উজ্জ্বল, আজও হৃদয়ের খুব কাছের।‘

সবশেষে ববিতা বলেন, মানুষ মনে করে নায়িকাদের মধ্যে শুধু প্রতিযোগিতা থাকে। কিন্তু তাদের সম্পর্ক ছিল তার সম্পূর্ণ উল্টো। ব্যক্তিগত জীবনে ছিল শুধু সম্মান, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা।

চলচ্চিত্রববিতাশাবানাস্মৃতিচারণ