বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
বিশ্লেষণ

নিষ্পাপ শৈশব কেন হচ্ছে নৃ’শং’সতার শিকার?

WhatsApp Image 2026-05-21 at 10.26.56 PM

শিশু মানেই নিরাপত্তা, কোমলতা আর নির্ভরতার প্রতীক। অথচ প্রতিদিনের সংবাদ খুললেই দেখা যায় ভয়ংকর এক বাস্তবতা- শিশুরাই হয়ে উঠছে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের সবচেয়ে বড় শিকার। কখনো স্কুলে, কখনো বাসায়, কখনো প্রতিবেশীর ঘরে, আবার কখনো অনলাইনের অন্ধকার ফাঁদে হারিয়ে যাচ্ছে একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব। প্রশ্ন উঠছে, কেন এত বেশি শিশু এই ভয়াবহ অপরাধের শিকার হচ্ছে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের অসহায়ত্ব ও নির্ভরশীলতাকেই অপরাধীরা সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে নেয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যেমন প্রতিবাদ করতে পারে, সাহায্য চাইতে পারে কিংবা আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে, একটি শিশু তা পারে না। ভয়, লজ্জা কিংবা বুঝতে না পারার কারণে তারা অনেক সময় নির্যাতনের কথাই কাউকে বলতে পারে না।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধী অপরিচিত কেউ নয়। বরং পরিবারের ঘনিষ্ঠ মানুষ, আত্মীয়, প্রতিবেশী, গৃহশিক্ষক কিংবা পরিচিত কেউ এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে। শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই পরিচিত মানুষকে বিশ্বাস করে। সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই ঘটে ভয়াবহ নির্যাতন।

সমাজের নীরবতাও এই অপরাধ বাড়ার অন্যতম কারণ। আমাদের দেশে যৌন নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখনও অনেক পরিবারে নিষিদ্ধ বিষয়। অনেক বাবা-মা সন্তানকে “ভদ্রতা” শেখালেও নিজের শরীরের নিরাপত্তা সম্পর্কে শেখান না। ফলে শিশুরা বুঝতেই পারে না কোন আচরণ স্বাভাবিক আর কোনটি অনিরাপদ। অনেক সময় শিশুর মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয় “মান-সম্মান” কিংবা “লোকলজ্জা”-র ভয় দেখিয়ে। এতে অপরাধীরা আরও সাহস পায়।

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অপব্যবহারও শিশু নির্যাতনের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। স্মার্টফোন, গেম, ফেসবুক, টিকটক বা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অপরাধীরা শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। ধীরে ধীরে তারা শিশুদের মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, ব্ল্যাকমেইল করে কিংবা দেখা করার ফাঁদে ফেলে। অনেক শিশুই না বুঝে ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য শেয়ার করে, যা পরে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়।

শুধু পরিবার বা সমাজ নয়, আইনের দুর্বল প্রয়োগও বড় একটি কারণ। অনেক নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হলেও বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়। কখনো প্রভাবশালীদের চাপে ঘটনা ধামাচাপা পড়ে। ফলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় কমে যায়। তারা বুঝে যায়, অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ধর্ষণ কেবল যৌন আকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়; এটি ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ ও বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। দুর্বল ও অসহায় কাউকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা থেকেই অনেক অপরাধী শিশুদের টার্গেট করে। সমাজে সহিংসতা, নারীর প্রতি অসম্মান ও বিকৃত বিনোদনের প্রভাবও এই মানসিকতাকে উসকে দেয়।

এই নির্যাতনের প্রভাব একটি শিশুর জীবনে ভয়াবহভাবে থেকে যায়। অনেক শিশু চুপচাপ হয়ে যায়, দুঃস্বপ্ন দেখে, আতঙ্কে ভোগে কিংবা মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। কারও কারও পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়। অনেক ক্ষেত্রে মানসিক ট্রমা সারাজীবন বহন করতে হয়।


তাহলে সমাধান কোথায়?

প্রথমত, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই “গুড টাচ” ও “ব্যাড টাচ” সম্পর্কে শেখাতে হবে। কোন স্পর্শ নিরাপদ আর কোনটি অনিরাপদ—এটি শিশুকে সহজ ভাষায় বোঝানো জরুরি। শিশুকে শেখাতে হবে, কেউ অস্বস্তিকর আচরণ করলে “না” বলতে হবে এবং বিশ্বাসযোগ্য বড় কাউকে জানাতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে। শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, ভয় পাওয়া, নির্দিষ্ট কারও কাছ থেকে দূরে থাকতে চাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক নীরবতা- এসব সংকেত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে ভয় ছাড়া সব কথা বলতে পারে।

তৃতীয়ত, স্কুল পর্যায়ে যৌন নিরাপত্তা শিক্ষা জরুরি। এটি কোনো লজ্জার বিষয় নয়; বরং আত্মরক্ষার শিক্ষা। পাশাপাশি অনলাইনে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিভাবকদেরও প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
সবশেষে প্রয়োজন দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা। যখন অপরাধীরা দেখবে যে এমন অপরাধের কঠিন পরিণতি আছে, তখনই অপরাধ কমানোর পথ তৈরি হবে।

শিশুরা এই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ মানুষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। একটি শিশু যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন শুধু একটি জীবন নয়, পুরো সমাজই আহত হয়। তাই শিশু সুরক্ষাকে পারিবারিক নয়, জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে দেখার সময় এখনই।

নিরাপত্তানিষ্পাপনৃ'শং'সতাভয়ংকরশিশুশৈশব