অন্যের জীবন নিয়েই কেন এত ব্যস্ত কিছু মানুষ?

জীবনটা যতটা নিজের মতো করে বাঁচার কথা, বাস্তবে তা অনেক সময় হয়ে ওঠে না। কারণ, আমাদের চারপাশেই এমন কিছু মানুষ থাকে, যারা সবসময় অন্যের জীবন নিয়েই ব্যস্ত। আপনি কী করছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কী অর্জন করলেন কিংবা কী সিদ্ধান্ত নিলেন- এসব নিয়ে তাদের অস্বাভাবিক আগ্রহ। কখনো সরাসরি সমালোচনা, কখনো পেছনে কথা বলা, কখনো বিদ্রুপ, আবার কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নীরব নজরদারি- সব মিলিয়ে যেন অন্যের জীবনে হস্তক্ষেপ করাই তাদের অভ্যাস।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত স্বভাব নয়; এর পেছনে রয়েছে নানা মানসিক সংকট, অপূর্ণতা ও সামাজিক বাস্তবতা। হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনালের সাইকোলজিস্ট ও টিম ম্যানেজার নাঈমা ইসলাম অন্তরা জানান, অন্যকে হেয় করা, মানসিকভাবে আঘাত দেওয়া, বিদ্বেষ ছড়ানো বা বুলিং- এসব আচরণের পেছনে কাজ করে হীনমন্যতা, ঈর্ষা, নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা, প্রতিশোধ প্রবণতা এবং আত্মমর্যাদার ঘাটতি।

নিজের অস্বস্তি ঢাকতেই অন্যকে আঘাত
খেয়াল করলে দেখা যায়, যারা সবসময় অন্যকে ছোট করতে চান বা কটাক্ষ করেন, তারা অনেক সময় নিজেদের জীবন নিয়েই অসন্তুষ্ট থাকেন। নিজের ব্যর্থতা, অপূর্ণতা বা অপ্রাপ্তিকে মেনে নিতে না পেরে তারা অন্যের দিকে আঙুল তোলেন। এতে সাময়িক এক ধরনের মানসিক স্বস্তি বা তৃপ্তি পান।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক আচরণ। যে ব্যক্তি নিজেকে যথেষ্ট সফল বা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না, তিনি অন্যের সাফল্যে অস্বস্তি অনুভব করেন। ফলে সমালোচনা, বিদ্রুপ কিংবা নেতিবাচক মন্তব্যের মাধ্যমে অন্যকে ছোট করার চেষ্টা করেন।
তুলনা থেকেই জন্ম নেয় ঈর্ষা
মানুষের স্বভাবই হলো নিজেকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করা। কে বেশি সুন্দর, সফল, জনপ্রিয় কিংবা সুখী—এই তুলনা থেকেই অনেক সময় ঈর্ষার জন্ম হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যের সাজানো-গোছানো জীবন দেখে অনেকেই নিজের জীবনকে ছোট মনে করেন। ফলে অন্যের সুখ কিংবা অর্জন সহ্য করতে না পেরে শুরু হয় খোঁচা দেওয়া, অবমূল্যায়ন কিংবা নেতিবাচক মন্তব্য।
অনেকেই আবার অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ দেখিয়ে একধরনের মানসিক তৃপ্তি পান। যেন নিজের জীবন থেকে মন সরিয়ে অন্যের জীবনেই বেশি ব্যস্ত থাকা সহজ।

নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়
সবসময় যে ঈর্ষা থেকেই মানুষ অন্যের পেছনে লাগে, তা নয়। অনেক সময় এর পেছনে থাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা। পরিবার, সম্পর্ক কিংবা কর্মক্ষেত্রে এমন মানুষ দেখা যায়, যারা চান সবাই তাদের মত অনুযায়ী চলুক। কেউ ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিলেই তারা বিরূপ হয়ে ওঠেন। কারণ, তারা মনে করেন অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই নিজের গুরুত্ব বজায় থাকবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আচরণের মূলেও থাকে অনিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়।
সমালোচনার মধ্যেই খোঁজেন গুরুত্ব
কিছু মানুষ আছেন, যারা অন্যকে নিয়ে আলোচনা তৈরি করেই নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে চান। তারা মনে করেন, কাউকে নিয়ে সমালোচনা করতে পারলে বা কারও জীবনে প্রভাব ফেলতে পারলে তারা আলোচনায় থাকবেন। ফলে দেখা যায়, যারা নিজের জীবনে ইতিবাচক কাজ কম করেন, তারা অনেক সময় অন্যের জীবন নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। অন্যকে নিয়ে গসিপ, সমালোচনা কিংবা অযাচিত মন্তব্য তাদের কাছে হয়ে ওঠে এক ধরনের সামাজিক বিনোদন।
সব সমালোচনা কি খারাপ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব সমালোচনাকেই নেতিবাচকভাবে দেখলে চলবে না। গঠনমূলক সমালোচনা অনেক সময় মানুষকে নিজের ভুল বুঝতে এবং উন্নতির সুযোগ তৈরি করতে সাহায্য করে।
তবে পার্থক্য হলো- গঠনমূলক সমালোচনার উদ্দেশ্য সংশোধন আর বিদ্বেষপূর্ণ সমালোচনার উদ্দেশ্য আঘাত দেওয়া। তাই সমালোচনার ধরন বুঝতে হবে। কাছের কেউ যদি সত্যিই ভালো চেয়ে ভুল ধরিয়ে দেন, তবে সেটিকে শেখার সুযোগ হিসেবেই দেখা উচিত।
বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ সামলাবেন যেভাবে
সাইকোলজিস্ট নাঈমা ইসলাম অন্তরা বলছেন, অন্যের নেতিবাচক আচরণে ভেঙে না পড়ে আগে বুঝতে হবে- যে ব্যক্তি আঘাত করছে, তার নিজের মধ্যেও হয়তো নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
কী করতে পারেন-
- সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া না দেখানো
- কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে শান্ত হওয়া
- শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন করা
- বিদ্রুপকে ব্যক্তিগতভাবে না নেওয়া
- প্রকৃত বিষয় বোঝার চেষ্টা করা
- নিজের অনুভূতি শান্তভাবে প্রকাশ করা
- নেতিবাচক মানুষের সঙ্গে সীমারেখা তৈরি করা
- প্রয়োজন হলে দূরত্ব বজায় রাখা
- ইতিবাচক ও সহায়ক মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বুলিং, অপমান বা মানসিক চাপের কারণে আত্মবিশ্বাস ভেঙে গেলে কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপির সহায়তা নেওয়াও জরুরি হতে পারে।
মানুষ কেন অন্যের পেছনে লাগে- তার উত্তর যতটা অন্যকে নিয়ে, তার চেয়ে বেশি সেই ব্যক্তির নিজের ভেতরের সংকট নিয়ে। তাই অন্যের বিদ্বেষকে নিজের মূল্যবোধের মাপকাঠি ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং নিজের মানসিক শান্তি, আত্মসম্মান ও সীমারেখা রক্ষা করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



