বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬
জীবনযাপন

লিফটে একা আটকা পড়লে কী করবেন?

WhatsApp Image 2026-05-21 at 10.37.28 PM

ঢাকার বহুতল ভবনগুলো যেন প্রতিদিন আরও একটু করে আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। অফিস, হাসপাতাল, শপিং মল কিংবা আবাসিক ভবন- সব জায়গাতেই এখন লিফট আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সিঁড়ি ভাঙার কষ্ট কমিয়ে কয়েক সেকেন্ডেই এক তলা থেকে আরেক তলায় পৌঁছে দিচ্ছে এই যন্ত্র। কিন্তু যন্ত্র মানেই তো কখনো না কখনো ত্রুটি। আর সেই ত্রুটি যদি ঘটে লিফটের ভেতরে, তখন অনেকের কাছেই পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আতঙ্কের।

বিশেষ করে লোডশেডিং, যান্ত্রিক সমস্যা বা বিদ্যুতের ওঠানামার কারণে মাঝপথে লিফট থেমে যাওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। হঠাৎ আলো নিভে যাওয়া, দরজা না খোলা কিংবা মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকা- এসব মিলিয়ে মুহূর্তেই ভয় গ্রাস করতে পারে কাউকে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আতঙ্কিত না হওয়া।


প্রথম কাজ- নিজেকে শান্ত রাখা

লিফটে আটকা পড়লে অনেকেই প্রথমেই চিৎকার শুরু করেন বা জোর করে দরজা খোলার চেষ্টা করেন। এতে বরং বিপদ বাড়তে পারে। কারণ আতঙ্ক শরীরের অক্সিজেনের চাহিদা বাড়িয়ে দেয়, হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে যায় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে আসে।

যাদের ক্লাস্ট্রোফোবিয়া আছে, অর্থাৎ ছোট বা বন্ধ জায়গায় থাকলে ভয় লাগে, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে লম্বা শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। মনোযোগ অন্যদিকে নিতে উল্টো দিক থেকে সংখ্যা গোনা, কোনো গান মনে মনে গাওয়া কিংবা ফোনে পরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলাও কাজে দিতে পারে। অনেকে ভাবেন, লিফটের ভেতরে অক্সিজেন শেষ হয়ে যাবে। বাস্তবে কিন্তু বেশির ভাগ আধুনিক লিফটেই বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকে। ফলে কিছু সময় আটকে থাকলেও শ্বাসরোধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সাধারণত থাকে না।

আলো নিভে গেলে কী করবেন?

হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক সময় লিফটের ভেতরের আলোও নিভে যায়। তখন প্রথমেই মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট চালু করুন। এতে ভেতরের অবস্থা বোঝা সহজ হবে এবং আতঙ্কও কিছুটা কমবে।

এরপর লিফটের বাটনগুলো খেয়াল করুন। সাধারণত দরজা খোলার জন্য দুই দিকে তির চিহ্ন দেওয়া একটি বাটন থাকে। সেটি চাপ দিয়ে দেখুন দরজা খোলে কি না। তবে দরজা সামান্য খুললেও সঙ্গে সঙ্গে বের হওয়ার চেষ্টা করবেন না। আগে নিশ্চিত হতে হবে লিফটটি কোনো তলার সমতলে আছে কি না।

যদি লিফট তলার মাঝখানে আটকে থাকে, তাহলে জোর করে বের হতে যাওয়া মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অনেক দুর্ঘটনাই ঘটে এভাবে বের হওয়ার চেষ্টার সময়।

সাহায্য চাওয়ার উপায়

বেশির ভাগ লিফটেই অ্যালার্ম বাটন বা ইন্টারকম থাকে। প্রয়োজনে অ্যালার্ম চাপুন। এতে ভবনের নিরাপত্তাকর্মী বা দায়িত্বে থাকা কেউ সতর্ক হতে পারবেন।

অনেক আধুনিক লিফটে দুই দিক থেকে কথা বলার ব্যবস্থা থাকে। তাই শান্তভাবে নিজের অবস্থান জানানোর চেষ্টা করুন। যদি ফোনে নেটওয়ার্ক থাকে, তাহলে পরিবারের সদস্য বা ভবনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকে কল করতে পারেন।

যদি বুঝতে পারেন কোনো নির্দিষ্ট তলার কাছে লিফট আটকে আছে, তাহলে দরজায় হালকা ধাক্কা দিয়ে বা শব্দ করে বাইরের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। বাইরে থেকে লিফট খোলা তুলনামূলক সহজ হয়।
জোর করে দরজা খোলা কেন বিপজ্জনক?

সিনেমায় প্রায়ই দেখা যায়, নায়ক দরজা ফাঁক করে বের হয়ে আসছেন। বাস্তবে কিন্তু বিষয়টি এত সহজ নয়। লিফটের নিচে গভীর শ্যাফট থাকে এবং সামান্য ভুলেও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিফটের দরজা নিজে থেকে খোলার চেষ্টা না করাই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত। কারণ লিফট হঠাৎ আবার চালু হয়ে গেলে শরীর আটকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আধুনিক লিফট কতটা নিরাপদ?

বর্তমানে অধিকাংশ নতুন লিফটে এআরডি বা অটোমেটিক রেসকিউ ডিভাইস থাকে। বিদ্যুৎ চলে গেলেও এই প্রযুক্তি লিফটকে ধীরে ধীরে নিকটবর্তী তলায় নিয়ে দরজা খুলে দেয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই যাত্রীরা কয়েক মিনিটের মধ্যেই বের হতে পারেন।

তবে সব ভবনে আধুনিক প্রযুক্তির লিফট নেই। পুরোনো লিফটগুলোর ক্ষেত্রে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। মাসে অন্তত একবার কারিগরি পরীক্ষা করা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

কিছু সতর্কতা দুর্ঘটনা কমাতে পারে

লিফটে ওঠার আগে ছোট একটি বিষয় খেয়াল করা খুব জরুরি- লিফটটি তলার সমতলে আছে কি না। কখনো যদি দেখেন লিফট একটু ওপরে বা নিচে থেমে আছে, তাহলে সেখানে ওঠার চেষ্টা করবেন না। আবার অনেকেই দরজা বন্ধ হওয়ার সময় দৌড়ে গিয়ে হাত বা পা দিয়ে আটকে লিফটে ঢোকার চেষ্টা করেন। এটি বিপজ্জনক অভ্যাস। সব লিফটের সেন্সর ঠিকভাবে কাজ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

শিশুদের একা লিফটে না ওঠাই ভালো। কারণ জরুরি পরিস্থিতিতে তারা ভয় পেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই সুরক্ষা। লিফটে আটকা পড়া নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি প্রাণঘাতী নয়, যদি সঠিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়। বরং আতঙ্ক, তাড়াহুড়া এবং ভুল সিদ্ধান্তই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় বেশি।

আমাদের শহর যত উঁচু হচ্ছে, লিফটের ওপর নির্ভরশীলতাও তত বাড়ছে। তাই শুধু লিফট ব্যবহার করলেই হবে না, এর নিরাপত্তাবিধি সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে। কারণ বিপদের মুহূর্তে ঠান্ডা মাথায় নেওয়া একটি সিদ্ধান্তই হয়তো আপনাকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে পারে।

আটকাবহুতল ভবনলিফটশান্তসাহায্য