কুরবানি নাকি আকিকা— কোনটি আগে?

ঈদুল আজহা সামনে এলেই অনেকের মনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে— কুরবানি না দিয়ে কি আকিকা করা যাবে? বিশেষ করে আর্থিক সংকট বা ঋণের কারণে অনেকে কুরবানির পরিবর্তে আকিকা করার চিন্তা করেন। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে কুরবানি ও আকিকা এক নয়; এ দুটি ভিন্ন ইবাদত এবং উভয়ের বিধানও আলাদা। তাই কোনটি আগে আদায় করতে হবে, কুরবানির পরিবর্তে আকিকা করা বৈধ কি না এবং শরিয়তের সঠিক নির্দেশনা কী— তা জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জরুরি।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
‘অতএব আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কুরবানি করুন।’ (সুরা আল-কাউসার: আয়াত ২)
কুরবানি ও আকিকা— দুটি আলাদা বিধান। এ দুই আমলের মধ্যে কুরবানি আদায় করা ওয়াজিব, আর আকিকা করা মুস্তাহাব। তাই কুরবানির ওপর আকিকাকে প্রাধান্য দেওয়া শরিয়তসম্মত নয়। ঈদুল আজহার দিন কুরবানি করতে না পারলে পরবর্তী আরও দুই দিন, অর্থাৎ ১১ ও ১২ জিলহজ পর্যন্ত কুরবানি আদায় করা যায়। ফলে সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য এই তিন দিনের যেকোনো একদিন কুরবানি করা আবশ্যক।
অন্যদিকে সন্তানের জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করা মুস্তাহাব। তবে সপ্তম দিনে সম্ভব না হলে পরে অন্য যেকোনো সময় আকিকা করা যাবে। আকিকা বিলম্বিত হলে গুনাহ হবে না। কিন্তু কারও ওপর কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার পরও যদি সে তা আদায় না করে, তাহলে সে গুনাহগার হবে।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَا عَمِلَ ابْنُ آدَمَ يَوْمَ النَّحْرِ عَمَلًا أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ مِنْ إِهْرَاقِ الدَّمِ
‘কুরবানির দিনের আমলসমূহের মধ্যে আল্লাহর কাছে পশুর রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে অধিক প্রিয় আর কিছু নেই।’ (তিরমিজি ১৪৯৩)
কোনো ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত হওয়ার কারণে যদি কুরবানি আদায় করতে না চান, তাহলে দেখতে হবে— ঋণের পরিমাণ বাদ দেওয়ার পর তার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট আছে কি না। যদি ঋণ বাদ দিয়েও তিনি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তাহলে তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব হবে।
নেসাব বলতে বোঝায়— কুরবানির দিনগুলোতে (১০, ১১ ও ১২ জিলহজ) কোনো ব্যক্তির কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার সমমূল্যের সম্পদ থাকা। এমন সম্পদের মালিক হলে তার ওপর কুরবানি আবশ্যক হয়ে যায়।
তবে কুরবানির পরিবর্তে শুধু আকিকা না করে, কুরবানির পশুতেই আকিকার অংশ রাখা যেতে পারে। এতে একই সঙ্গে কুরবানি ও আকিকা— উভয়টিই আদায় হয়ে যাবে। গরু, মহিষ ও উটের কুরবানিতে আকিকার নিয়তে শরিক হওয়া জায়েজ। এ ক্ষেত্রে ছেলের জন্য দুই অংশ এবং মেয়ের জন্য এক অংশ নির্ধারণ করতে হবে।
হজরত সালমান ইবনে আমির আদ-দাব্বি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَعَ الْغُلَامِ عَقِيقَةٌ فَأَهْرِيقُوا عَنْهُ دَمًا وَأَمِيطُوا عَنْهُ الْأَذَى
‘শিশুর পক্ষ থেকে আকিকা রয়েছে। তাই তার পক্ষ থেকে পশু জবাই করো এবং তার থেকে কষ্টদায়ক বস্তু (চুল) দূর করো।’ (বুখারি ৫৪৭১)
ইসলামে কুরবানি ও আকিকা উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলেও তাদের মর্যাদা ও বিধান এক নয়। কুরবানি সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব, পক্ষান্তরে আকিকা মুস্তাহাব। তাই কুরবানি বাদ দিয়ে শুধু আকিকা করা শরিয়তের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। বরং সামর্থ্য থাকলে আগে কুরবানি আদায় করতে হবে। একই সঙ্গে কুরবানির পশুতে আকিকার অংশ রেখে উভয় আমল একত্রে আদায় করার সুযোগও ইসলামে রয়েছে। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত শরিয়তের বিধান জেনে সঠিকভাবে আমল করা।



