বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬
জীবনযাপন

ডোপামিনের খেলা: সুখের হাতছানি নাকি অতৃপ্তির নেশা?

360_F_694850847_tyHLkTdkSiEGwH9U8njPNnx9kndjLFNt

ডোপামিন কি সত্যিই ‘সুখ’ দেয়- এই প্রশ্নের উত্তরটা যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। সোশ্যাল মিডিয়া, গেমিং, খাবার কিংবা প্রেম- সব কিছুর সাথেই ডোপামিনের নাম জড়িয়ে গেছে। অনেকেই মনে করেন ডোপামিন মানেই সুখের হরমোন। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন এবং আরও গভীর।

ডোপামিন মূলত একটি নিউরোট্রান্সমিটার, যা আমাদের মস্তিষ্কে বার্তা আদান-প্রদানের কাজ করে। এটি আমাদের মোটিভেশন, আগ্রহ, শেখা এবং পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। অর্থাৎ, ডোপামিন সরাসরি সুখ তৈরি করে না; বরং এটি আমাদেরকে এমন কাজ করতে উৎসাহিত করে, যা আমাদের কাছে “সুখদায়ক” মনে হয়।

ডোপামিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো মোটিভেশন তৈরি করা। আপনি কেন সকালে উঠে কাজ করতে যান? কেন নতুন কিছু শিখতে আগ্রহী হন? কেন কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য পরিশ্রম করেন? – এই সব কিছুর পেছনে ডোপামিনের বড় ভূমিকা রয়েছে।

ধরা যাক, আপনি আপনার প্রিয় খাবার খাচ্ছেন বা কোনো অর্জন করেছেন- এই মুহূর্তে ডোপামিন নিঃসরণ হয়। কিন্তু এটি আসলে সুখের অনুভূতি তৈরি করার জন্য নয়, বরং মস্তিষ্ককে সংকেত দেয়- “এই কাজটি ভালো, ভবিষ্যতেও এটি করো।” তাই ডোপামিনকে অনেক বিজ্ঞানী “reward prediction chemical” বা পুরস্কার প্রত্যাশার রাসায়নিক হিসেবে উল্লেখ করেন।

ডোপামিন: সুখ নয়, প্রত্যাশার শক্তি

গবেষণায় দেখা গেছে, ডোপামিন আসলে “wanting” বা চাওয়ার অনুভূতি তৈরি করে, “liking” বা উপভোগ করার অনুভূতি নয়। অর্থাৎ, আপনি কোনো কিছু পাওয়ার আগে যতটা উত্তেজনা বা আগ্রহ অনুভব করেন- সেটাই ডোপামিনের কাজ। ধরুন আপনি পরীক্ষার রেজাল্টের অপেক্ষায় আছেন। রেজাল্ট বের হওয়ার আগের সময়টায় আপনি বারবার ভাবছেন- কি হবে, কত পাবো। এই উত্তেজনা, আগ্রহ- এটাই ডোপামিন-চালিত। কিন্তু রেজাল্ট হাতে পাওয়ার পর যে স্বস্তি বা আনন্দ অনুভব করেন, তা শুধু ডোপামিন নয়- অন্যান্য রাসায়নিক যেমন সেরোটোনিনও কাজ করে।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে ডোপামিনের বিষয়টি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন, লাইক, কমেন্ট- এসব ছোট ছোট পুরস্কার আমাদের মস্তিষ্কে ডোপামিনের ক্ষণস্থায়ী ঢেউ তৈরি করে। এর ফলে আমরা বারবার ফোন চেক করতে থাকি। এই চক্রটি অনেক সময় আসক্তির মতো আচরণ তৈরি করে। যেমন- আপনি একটি ছবি পোস্ট করলেন। এরপর বারবার ফোন চেক করছেন- কয়টা লাইক হলো, কে কমেন্ট করলো। প্রতিবার নোটিফিকেশন দেখলে মস্তিষ্কে ছোট ছোট ডোপামিন স্পাইক তৈরি হয়। এতে আপনি সাময়িক ভালো লাগা অনুভব করেন, কিন্তু এই অভ্যাস আপনাকে বারবার একই কাজ করতে বাধ্য করে।

ডোপামিন না থাকলে কী হতো?

এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ডোপামিন না থাকলে কী হতো? ১৯১৫-২৬ সালের দিকে ‘এনসেফালাইটিস লেথারজিকা’ নামক এক রহস্যময় রোগে অনেক মানুষ এক ধরনের জড়তায় চলে গিয়েছিল। তারা ক্ষুধার্ত থাকলেও হাত বাড়িয়ে খাবার খেত না, কেউ বল ছুঁড়ে দিলেও ধরত না। তাদের শরীরে মূলত ডোপামিনের অভাব দেখা দিয়েছিল। ডোপামিনের অভাব মানুষকে পঙ্গু করে না, বরং তাকে এক ‘অন্ধকার কক্ষে’ বন্দি করে ফেলে যেখানে কোনো অনুভূতি বা কাজের ইচ্ছা অবশিষ্ট থাকে না।

সমস্যা কোথায়?


সমস্যা তখনই হয়, যখন আমরা খুব সহজে এবং দ্রুত ডোপামিন পেতে অভ্যস্ত হয়ে যাই। যেমন:

-সারাদিন ফোন স্ক্রল করা

-অতিরিক্ত গেম খেলা

-জাঙ্ক ফুড খাওয়া

– অপ্রয়োজনীয় ভিডিও দেখা

এইসব কাজ আমাদের মস্তিষ্ককে “instant reward” বা তাৎক্ষণিক পুরস্কারের দিকে অভ্যস্ত করে তোলে। ফলে বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ধীরগতির কাজগুলো করতে ইচ্ছা কমে যায়।

কিভাবে ভারসাম্য রাখা যায়?

ডোপামিনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিছু কার্যকর উপায় হলো:

নিয়মিত ব্যায়াম: এটি প্রাকৃতিকভাবে ডোপামিন বাড়ায়।

পর্যাপ্ত ঘুম: মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য ঠিক রাখে।

ডিজিটাল ডিটক্স: সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ।

ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ: ছোট সাফল্য আপনাকে চালিয়ে যেতে সাহায্য করে।

Delayed gratification চর্চা: তাৎক্ষণিক আনন্দ এড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি লাভের দিকে মনোযোগ দেওয়া।

ডোপামিন সরাসরি সুখ দেয় না – এটি আমাদেরকে সুখের দিকে চালিত করে। তাই ডোপামিনকে “সুখের হরমোন” হিসেবে না দেখে, বরং “প্রেরণার ইঞ্জিন” হিসেবে দেখা উচিত। সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটি আপনার জীবনকে আরও অর্থবহ এবং পরিপূর্ণ করে তুলতে পারে।

অতৃপ্তিডোপামিনসুখ