বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬
সাহিত্য-সংস্কৃতি

গানে গানে রবীন্দ্রনাথের বর্ষাবন্দনা

1608507616_5fdfe0e0bad04_pic

‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’ দিয়ে যে কিশোর রবির বর্ষার বন্দনা শুরু হয়েছিল, সেই রবি সারাজীবনই বাংলার বর্ষার প্রেমে মোহাবিষ্ট হয়ে ছিলেন। শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নয়, বাংলার বর্ষাকে নিয়ে সব মানুষই কম-বেশি আবেগাপ্লুত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ষাকে তার গানে অন্য মাত্রা দিয়েছেন। শুধু বর্ষা বন্দনার গানই লিখেছেন একশোটিরও বেশি। পৃথিবী জুড়ে যখন অশান্তি, যুদ্ধ-খরা, তখন রবীন্দ্রনাথ এর গানে আমরা গেয়ে উঠি- ‘বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি/ শুষ্ক হৃদয় লয়ে আছে দাঁড়ায়ে ঊর্ধ্ব মুখে নর-নারী।’ প্রেম ও প্রকৃতিকে রবীন্দ্রনাথ একাত্ম করে ফেলেছেন বহু জায়গায়। ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছো দান’ এই গান দিয়ে আমরা প্রকৃতি ও প্রেমকে আজও উদযাপন করি সানন্দে।বর্ষা রবিকে প্রথম কদম ফুল দিয়েছে, রবিও তার শ্রাবণের গান আষাঢ়ের দিনের পায়ের কাছে সমর্পণ করেছেন অকাতরে।

বৃষ্টি ও বর্ষা নিয়ে পৃথিবীর আর কোথাও এমন উৎসব নেই, এমন নিবেদন নেই। পৃথিবীর অন্য কোনো অঞ্চলে বর্ষা ঋতু স্বাতন্ত্র্য মর্যাদা পায়নি, যেমনটা এই বঙ্গভূমিতে পেয়েছে। আর বর্ষাকে এমন মোহনীয় ভঙ্গিমায়, এমন রূপ-রস-মাধুর্যে কে সাজাতে পেরেছেন রবীন্দ্রনাথ ছাড়া? রবীন্দ্রনাথের গানেই আমরা দেখি, রবি আমাদেরকে আহ্বান করছেন, ‘এসো নীপবনে ছায়াবিথী তলে/ এসো স্নান করি নবধারা জলে।’ আকাশে মেঘের ঘনঘটা দেখলেই আমাদের মন গেয়ে ওঠে- ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী/ উড়ে চলে দিক-দিগন্তের পানে।’ হংস-বলাকার পাখায় আমাদের মন যেন বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে যায়, শ্রাবণের যে বর্ষণ-সংগীত তা আমাদেরকে নিয়ে যায় দূর থেকে দূরে। আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে, জানি নে জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না’ জনপ্রিয় রবীন্দ্রনাথের এ গানটি প্রেমিকের মন উচাটন করে তোলে; বিরহী করে তোলে। আবেদন তোলে মনের কথা বলার-‘ এমন দিনে তারে বলা যায়/ এমন ঘনঘোর বরষায়’ রবীন্দ্রনাথের গানে-গানেই।

এরকম অসংখ্য গান-কবিতা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বর্ষাকে সাজিয়ে তুলেছেন। রবীন্দ্রনাথ তার ব্রজবুলি ভাষার গান ‘ভরা বাদর, মহা ভাদর /শূন্য মন্দির মোর’ দিয়ে প্রিয়তম এর জন্য বর্ষার যে হাহাকার দেখিয়েছেন, তা বাংলা গান-কবিতায় বিরল। রবীন্দ্রনাথের প্রথম বর্ষার গান হিসেবে ধরা হয় ব্রজবুলি ভাষার ‘শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা’ গানটিকে। মাত্র ষোল বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ গানটি রচনা করেছিলেন। এর পরে বেশ কিছুকাল বিরতির পরে একুশ বছর বয়সে রচনা করেন ‘গহন ঘন ছাইল’ দ্বিতীয় বর্ষার গানটি। গানটি ‘কালমৃগয়া’ গীতিনাট্যে ব্যবহৃত হয় এবং সম্ভবত নাটকের প্রয়োজনেই পূর্ববর্তী কোনো হিন্দি শাস্ত্রীয় সংগীতের আদর্শে রচিত। রবীন্দ্রনাথের প্রথম বর্ষার গানটি তার বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছেও ভীষণ জনপ্রিয় ছিল। বর্ষার মেঘপুঞ্জকে স্বাগত জানাতে এ এক সুখকর উপলক্ষ।

বাংলাদেশের, বিশেষ করে গ্রামবাংলায় বর্ষা বর্ষণের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটেছিল মূলত জমিদারি দেখাশোনার সুবাদে। বজরায় ভেসে তিনি যখন শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসর অঞ্চলে আসতেন, সেই আসা-যাওয়ার অবকাশে, নদীমাতৃক বর্ষার গ্রামবাংলাকে স্বরূপে চিনে নিয়েছিলেন তিনি। বাংলার ওই প্রকৃতি তার চেতনায় স্থায়ী আবাস গড়ে তুলেছিল। তার মাধ্যমেই রবীন্দ্রনাথ বাংলার বর্ষার মায়ায় পড়ে গেছিলেন। অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা তার ডারউইনবাদ ও রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিভাবনা প্রবন্ধে লিখেছেন—’রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রকৃতি-সাহিত্যের রাজাধিরাজ। আমি সর্বদাই কবির কাছে নতশির, কৃপাপ্রার্থী, তাঁর অফুরান ভাণ্ডার থেকে দুহাত ভরে কুড়োই সম্মোহক আনন্দের খোরাক, লিখতে বসে তুলে নিই তার শব্দ ও শব্দগুচ্ছ, কাছে রাখি বনবাণী, সঞ্চয়িতা, গীতবিতান।’

‘মেঘমল্লারে সারা দিনমান,/ বাজে ঝরনার গান…’ বর্ষার রাগে মেঘমল্লারে যেন বৃষ্টির ছবিই এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এঁকেছেন এক মনের আনন্দে নৃত্যের ছবি, ‘মম চিত্তে, নীতি নৃত্যে কে যে নাচে, তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ, তা তা থৈ থৈ’। এই যে মনের আনন্দ, বেদনা, হাহাকার এত চমৎকারভাবে আর কেউই বর্ষাকে কেন্দ্র করে বাংলা গানে ফুটিয়ে তুলতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথ বৃষ্টিকে দেখেছেন শিলাইদহ থেকে শান্তি নিকেতন অবধি। দেখেছেন আদি থেকে অন্তে, মিলন থেকে বিরহে, প্রদাহ থেকে প্রার্থনায়।

আষাঢ়গানবর্ষাবন্দনাবর্ষার গানরবি ঠাকুররবীন্দ্রনাথরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর