আজ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকী: ‘একাত্তরের দিনগুলি’র বাইরেও যে বইগুলো পড়া জরুরি

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সন্তান রুমীকে হারিয়ে ব্যক্তিগত শোককে জাতীয় সংগ্রামে রূপ দিয়েছিলেন এক জননী। তিনি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আপসহীন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। আজ (২৬ জুন) এই মহান ব্যক্তিত্বের মৃত্যুবার্ষিকী।
এই দিনটি এলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে এক সাহসী মায়ের মুখ—যিনি শুধু নিজের সন্তান হারানোর শোক বয়ে বেড়াননি, বরং সেই শোককে পরিণত করেছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে আজীবনের সংগ্রামে। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি যেমন একজন আপসহীন সংগঠক, তেমনি বাংলা সাহিত্যেরও এক গুরুত্বপূর্ণ নাম।

জাহানারা ইমামের নাম উচ্চারিত হলেই প্রথমেই মনে আসে তার কালজয়ী দিনলিপি ‘একাত্তরের দিনগুলি’। স্কুলজীবনে বইটি পড়তে গিয়ে চোখ ভিজে উঠেনি এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া দায়। কারণ এটি শুধু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নয়, এটি একজন মা, একজন স্ত্রী এবং একজন সাধারণ মানুষের চোখে যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতার দলিল।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কীভাবে বদলে যায় একটি পরিবারের প্রতিটি দিন, কীভাবে রান্নাঘর, অন্দরমহল কিংবা বসার ঘরেও যুদ্ধের ছায়া নেমে আসে, কীভাবে একজন মা প্রতিদিন ছেলের ফিরে আসার অপেক্ষায় বুক বেঁধে থাকেন—এসবই তিনি অসাধারণ মমতা আর সততায় তুলে ধরেছেন। তার বড় ছেলে রুমীর যুদ্ধে যাওয়া, বন্দি হওয়া এবং শহীদ হওয়ার প্রতিটি মুহূর্ত তিনি লিখে গেছেন এমন আন্তরিকতায়, যা আজও পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে। এ কারণেই ‘একাত্তরের দিনগুলি’ শুধু একটি বই নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
এক বইয়ের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া সাহিত্যিক
কিন্তু জাহানারা ইমামকে কি শুধু ‘একাত্তরের দিনগুলি’ দিয়েই চেনা যায়?
সম্ভবত না।
৬৩ বছরের জীবনে তিনি মোট ২২টি বই লিখেছেন। অথচ তার অন্য সাহিত্যকর্মগুলো নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়। লড়াকু রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে তার সাহিত্যিক সত্তা।
একাত্তরের পর তার জীবন, স্বামী ও সন্তান হারানোর শূন্যতা এবং নিজের ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা পাওয়া যায় ‘অন্য জীবন’ বইয়ে। এটি একাধারে স্মৃতিকথা, আবার একজন নারীর অবিশ্বাস্য মানসিক শক্তিরও দলিল।

এ ছাড়া ‘বুকের ভেতরে আগুন’, ‘নাটকের অবসান’ এবং ‘প্রবাসের দিনলিপি’ বইগুলোতেও উঠে এসেছে তার গভীর পর্যবেক্ষণ, সমাজচেতনা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অনন্য প্রকাশ।
বিশেষ করে ‘প্রবাসের দিনলিপি’ বইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি শুধু নিজের গল্প বলেননি; বরং বিদেশি সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রাকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন।
শিশু-কিশোর সাহিত্যে এক অনন্য অবদান
অনেকেই জানেন না, জাহানারা ইমাম শিশু-কিশোর সাহিত্যেরও একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক ও অনুবাদক।
মার্কিন লেখিকা লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডারের বিখ্যাত ‘লিটল হাউস’ সিরিজ বাংলায় অনুবাদ করে তিনি বাংলা ভাষার কিশোর পাঠকদের জন্য নতুন এক জগতের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। তার অনূদিত ‘তুষার যুগের রোমাঞ্চ’, ‘নদীর তীরে কুটির’ এবং ‘তেপান্তরের ছোট্ট শহর’ আজও মূল্যবান অনুবাদ সাহিত্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শুধু অনুবাদ নয়, তিনি শিশুদের জন্য লিখেছেন মৌলিক গল্পও। ‘গজকচ্ছপ’ ও ‘সাতটি তারার ঝিকিমিকি’ বই দুটিতে শিশুদের কল্পনাজগৎ, মানবিকতা ও মূল্যবোধকে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক নারী
১৯২৯ সালের ৩ মে বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জাহানারা ইমাম।
শৈশব থেকেই তার বাবা সৈয়দ আবদুল আলী মেয়ের শিক্ষা ও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। বাড়িতে নিয়মিত আসা পত্রিকা এবং বাবার বন্ধুদের দেওয়া বই তার চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করে।
সমাজ যখন নারীদের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে অভ্যস্ত, তখন জাহানারা ইমাম ঢাকার রাস্তায় নিজেই গাড়ি চালাতেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এটি ছিল অত্যন্ত বিরল দৃশ্য। তার এলিফ্যান্ট রোডের বাসা ‘কণিকা’ ছিল সে সময়ের সাহিত্যিক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের মিলনকেন্দ্র।
তিনি ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। পাশাপাশি শিক্ষকতা করেছেন ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজেও। সংসার, চাকরি, সাহিত্যচর্চা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—সবকিছুই তিনি অসাধারণ দক্ষতায় একসঙ্গে সামলেছেন।
শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সংগ্রাম
জীবনের শেষ অধ্যায়েও তিনি থেমে যাননি।
ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে তার কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে যায়। তখন ছোট ছোট চিরকুট লিখেই মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা তার মানসিক দৃঢ়তাকে একটুও দুর্বল করতে পারেনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তিনি শেষ দিন পর্যন্ত সোচ্চার ছিলেন।
১৯৯৪ সালের ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের মাউন্ট সাইনাই হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তার মৃত্যু কোনো আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটায়নি; বরং ন্যায়বিচারের দাবিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
তাকে নতুন করে পড়ার সময় এখনই
আজ ২৬ জুন তার মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা যখন জাহানারা ইমামকে স্মরণ করি, তখন শুধু ‘একাত্তরের দিনগুলি’ নয়, তার সমগ্র সাহিত্যকর্মের প্রতিও নতুন করে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি ছিলেন একাধারে লেখক, শিক্ষক, অনুবাদক, সংস্কৃতিকর্মী, সংগঠক এবং সর্বোপরি একজন সাহসী মা। তার প্রতিটি পরিচয় আমাদের ইতিহাস, সাহিত্য ও সমাজকে সমৃদ্ধ করেছে।
জাহানারা ইমামকে জানার সবচেয়ে ভালো উপায় কেবল তার সংগ্রামের ইতিহাস জানা নয়; বরং তার লেখাগুলো পড়া। কারণ তার বইয়ের পাতায় আমরা খুঁজে পাই এক নারীর ব্যক্তিগত জীবন, একটি জাতির সংগ্রাম এবং মানবিকতার এক অনন্য দলিল—যার প্রাসঙ্গিকতা আজও অমলিন।



