বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬
জীবনযাপন

শৈশব এখন আর স্মৃতি নয়, সোশ্যাল-মিডিয়ার প্রদর্শনী- আতঙ্কে দিন কাটছে বড় হওয়া সেই শিশুদের

screenshot_2026-04-16_at_21-58-05_shaishb_chil_baabaa-maayer_seaashyaal_middiyaa_knttentt_ekhn_aatngke_din_kaattche_bdd_hoyaa_sei_shishuder_the_business_standard (1)

আমাদের অনেকেরই শৈশবের বিব্রতকর ছবি বা ভিডিওগুলো ধুলোমাখা অ্যালবামে বা পুরনো ভিএইচএস টেপের ভেতরেই নিরাপদে সংরক্ষিত আছে। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের সেই সৌভাগ্য নেই। জন্মের পর থেকেই তারা বাবা-মায়ের সোশ্যাল মিডিয়ার ‘কন্টেন্ট’ হিসেবে বড় হচ্ছে। আর ২০০৬ সালে ফেসবুক সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পর যে প্রজন্ম এভাবে বড় হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাদের এখন এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভীতিকর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

ডিজিটাল পদচিহ্নের নির্মম শিকার: কেমি ব্যারেটের গল্প

২৪ বছর বয়সী কেমি ব্যারেট এমনই একজন, যার পুরো শৈশব তার মায়ের ফেসবুক টাইমলাইনে উন্মুক্ত ছিল। গোসলের ছবি থেকে শুরু করে অসুস্থতা, দত্তক হওয়ার তথ্য, এমনকি দুর্ঘটনার খবর—সবকিছুই জনসমক্ষে শেয়ার করা হতো। এর পরিণতি ছিল ভয়াবহ। ১২ বছর বয়সে ইন্টারনেট থেকে তথ্য পেয়ে এক অপরিচিত ব্যক্তি তাকে অনুসরণ করে বাড়ি পর্যন্ত চলে আসে। পরবর্তীতে স্কুলে সহপাঠীরা তার মায়ের পোস্ট করা ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে তাকে নিয়মিত উত্ত্যক্ত করত, যার জেরে একপর্যায়ে তাকে স্কুলও ছাড়তে হয়।

অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তির কারণে বর্তমানে কেমির সাথে তার মায়ের কোনো সম্পর্ক নেই। শৈশবের সেই ট্রমা তাকে এতটাই তাড়া করে ফেরে যে, তিনি এখন কাছের বন্ধু বা বাগদত্তাকেও ব্যক্তিগত কথা বলতে ভয় পান। তার মনে সারাক্ষণই এই আতঙ্ক কাজ করে—এই তথ্যগুলোও অনলাইনে তার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না তো?

একটি ব্যক্তিগত মুহূর্ত, লাখো মানুষের উপহাস

চার বছর বয়সী শিশু মিলির ঘটনাটি এ ক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ। বড়দিনে প্রত্যাশিত উপহার না পেয়ে সে যখন কান্নায় ভেঙে পড়ে, তার বাবা-মা সেই দৃশ্য ধারণ করে টিকটকে ছেড়ে দেন। মূলত উপহারের স্যুটকেসের ভেতরে ডিজনী ক্রুজ-এর টিকিট লুকানো ছিল, যা ওই শিশুটির বোঝার কথা নয়। অথচ তার এই কান্নার ভিডিও ৯ মিলিয়ন অপরিচিত মানুষ দেখেছে এবং সেখানে হাজার হাজার মানুষ তাকে নিয়ে উপহাসমূলক মন্তব্য করেছে। দুই দশক আগে যা কেবল একটি পারিবারিক হাসির খোরাক হতে পারত, আজ তা একজন শিশুর ডিজিটাল পরিচয় নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

কেন বাবা-মায়েরা এমন করেন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান লালন-পালনের মতো একটি অদৃশ্য ও প্রায়ই কৃতজ্ঞতাহীন কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বাবা-মায়েরা সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক ও কমেন্টের মাধ্যমে ইতিবাচক অনুপ্রেরণা খোঁজেন। ‘মমফ্লুয়েন্সড’ বইয়ের লেখক সারা পিটারসেনের মতে, “একটি সুন্দর ছবি পোস্ট করার পর ১০-১২ জন মানুষের প্রশংসাসূচক মন্তব্য বাবা-মায়েদের আনন্দ দেয়।”

এর বাইরে রয়েছে আর্থিক প্রলোভন। ইউটিউব বা টিকটকে ফ্যামিলি ভ্লগিং করে অনেক পরিবার বিশাল অংকের অর্থ ও স্পন্সরশিপ আয় করছে। কিন্তু এই উপার্জনে শিশুদের কোনো আইনি অধিকার নেই, এবং তাদের সম্মতি ছাড়াই তাদের জীবনকে জনসমক্ষে পণ্যে পরিণত করা হচ্ছে।

সচেতনতা ও প্রতিরোধ

‘ফ্যামিলি অনলাইন সেফটি ইনস্টিটিউট’-এর সিইও স্টিফেন বালকাম জানান, অতিরিক্ত শেয়ারিংয়ের কারণে ছোট শিশুরাও এক ধরনের মানসিক অস্বস্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ১০-১২ বছরের পরিপক্ক শিশুরা নিজেরাই তাদের বাবা-মাকে প্রশ্ন করছে—তারা কী ভেবে এসব পোস্ট করেছেন?

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বাবা-মায়েদের মধ্যে সন্তানদের দৈনন্দিন কাজের ছবি বা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার প্রবণতা প্রবল। কিন্তু সন্তানের সম্মতি ছাড়া তাদের জীবন অনলাইনে উন্মুক্ত করে দেওয়াটা যে মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে, এই প্রতিবেদনটি তার জ্বলন্ত প্রমাণ। সাময়িক লাইক, কমেন্ট বা ভিউয়ের আশায় বাবা-মায়েরা যেন নিজেদের অজান্তেই সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য কোনো স্থায়ী আতঙ্কের কারণ হয়ে না দাঁড়ান, সে বিষয়ে এখনই সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

আতঙ্কশৈশবসোশ্যাল-মিডিয়াস্মৃতি