বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১০ জুন, ২০২৬
নারী

এভারেস্টজয়ী প্রথম আফগান নারী

HI3A83yWwAA2ILc

বরফে মোড়া পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ শুধু উচ্চতার পরীক্ষা নয়- এটি মানব ইচ্ছাশক্তিরও এক নির্মম পরিমাপ। সেই চূড়ায় দাঁড়িয়ে ইতিহাস লিখেছেন আফগান পর্বতারোহী জাকিয়া আহমেদ রিভার, যিনি প্রথম আফগান নারী হিসেবে জয় করেছেন মাউন্ট এভারেস্ট। কিন্তু এই জয় শুধু একটি পর্বতশৃঙ্গ স্পর্শ করার গল্প নয় এটি যুদ্ধ, নিপীড়ন, শরণার্থী জীবন এবং অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এক দীর্ঘ মানবিক যাত্রার প্রতিচ্ছবি।

গত ২১ মে, নেপালের সময় সকাল ৭টা ২০ মিনিটে তিনি যখন এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখেন, তখন সেই মুহূর্তটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না; বরং তা হয়ে ওঠে শত শত বছর ধরে দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদের প্রতীক। তালিবান শাসনে আফগান নারীদের যে জীবন সংকুচিত হয়ে এসেছে- শিক্ষা, চলাফেরা, কাজ, এমনকি স্বপ্ন দেখার অধিকার পর্যন্ত যেখানে সীমিত-সেই বাস্তবতার মধ্যেই জাকিয়ার এই জয় এক নতুন ভাষা তৈরি করেছে: প্রতিরোধের ভাষা।

জাকিয়ার শৈশব কেটেছে আফগানিস্তানের গজনি প্রদেশে। কৈশোরে তিনি এমন এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, যা তাঁর জীবনকে চিরতরে বদলে দেয়। কাবুলগামী এক যাত্রায় তালিবান হামলায় আক্রান্ত বাসে তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ান। সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে তিনি নিজের শরীরকে নিথর করে মৃতের ভান করে পড়ে থাকেন-এক ভয়ংকর কৌশল, যা তাঁকে বাঁচিয়ে দেয়। এই এক অভিজ্ঞতাই যেন তাঁর জীবনের সংজ্ঞা বদলে দেয়: বেঁচে থাকা মানে শুধু অস্তিত্ব নয়, বরং প্রতিরোধ।

পরবর্তীতে পরিবারের এক প্রিয় সদস্যকে হারিয়ে এবং ক্রমাগত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে তিনি আফগানিস্তান ছাড়তে বাধ্য হন। শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেন অস্ট্রেলিয়ায়। বর্তমানে তিনি মেলবোর্নের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটির-এর শিক্ষার্থী। কিন্তু শরণার্থী জীবনের অনিশ্চয়তা তাঁকে থামিয়ে দেয়নি; বরং সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর নতুন পরিচয়ের যাত্রা-পর্বতারোহী হিসেবে।

মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে তিনি পাহাড়কে বেছে নেন থেরাপি হিসেবে। ধীরে ধীরে পাহাড়ই হয়ে ওঠে তাঁর আত্মপরিচয়ের কেন্দ্র। এভারেস্টের আগে তিনি জয় করেছেন ফ্রান্সের মন্ট ব্লাঙ্ক, ভারতের নন্দা দেবী এবং আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ নওশাক। প্রতিটি আরোহন ছিল তাঁর ভেতরের ভাঙা অংশগুলোকে জোড়া লাগানোর একেকটি ধাপ।

এভারেস্ট অভিযানের সময় তাঁর শরীরের ক্লান্তি, অক্সিজেনের ঘাটতি এবং চরম আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই চলছিল। কিন্তু তাঁর মানসিক শক্তির উৎস ছিল আফগানিস্তানের অবরুদ্ধ নারীরা। তিনি বারবার ভাবছিলেন-যে মেয়েরা চার দেয়ালের ভেতর স্বপ্ন হারাচ্ছে, তাদের জন্যও তিনি এগিয়ে যেতে চান। সেই ভাবনাই তাঁকে প্রতিটি কঠিন ধাপে টেনে নিয়ে গেছে।

শৃঙ্গ ছোঁয়ার মুহূর্তে তিনি যখন স্যাটেলাইট ফোনে বেসক্যাম্প থেকে অভিনন্দন পান, তখন তাঁর আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি। তিনি বারবার চিৎকার করে বলেন, “দয়া করে আমার মাকে ফোন করো! মাকে জানাও আমি পেরেছি।” সেই একটি বাক্যেই মিশে ছিল সন্তান, শরণার্থী, যোদ্ধা এবং স্বপ্নবাজ এক নারীর পুরো জীবন।

তাঁর বোন মুঝগান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “আমার বোন শুধু একটি পাহাড় জয় করেনি, সে জয় করেছে ভয়, সীমাবদ্ধতা এবং অসম্ভবকে।” এই কথাগুলো যেন পুরো আফগান নারীর সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
জাকিয়ার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়-অত্যাচার যতই গভীর হোক, মানুষের ভেতরের আলো কখনো পুরোপুরি নিভে যায় না। কখনো তা পাহাড় হয়ে দাঁড়ায়, কখনো তা নিঃশব্দ প্রতিবাদ হয়ে ওঠে, আবার কখনো তা এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে আমি আছি, আমি পারি।

আজ মাউন্ট এভারেস্ট শুধু পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ নয়; এটি হয়ে উঠেছে এক আফগান নারীর সাহস, বেঁচে থাকা এবং অন্ধকার পেরিয়ে বাড়ি ফেরার স্বপ্নের প্রতীক।

আফগানএভারেস্টনারীপ্রথম