বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬
সাহিত্য-সংস্কৃতি

যেভাবে এলো পহেলা বৈশাখ

pohela boishakh-768×432

বৈশাখ মাসের প্রথম দিন সারা দেশব্যাপী যে বর্ণাঢ্য উৎসব পালিত হয় তা পহেলা বৈশাখের আয়োজনকে সর্বজনীন উৎসব এ পরিণত করেছে। এই উৎসবে সকল ধর্মের মানুষ অংশগ্রহণ করে। কিন্তু পহেলা বৈশাখ উদযাপনের রীতি অধুনা কালের নয়। বরং প্রাচীনকাল থেকে এই উৎসব গ্রামে-গঞ্জে পালিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে। বঙ্গাব্দ সনের শুরু হয় প্রধানত কৃষকের সুবিধার্থে। কৃষক ও কৃষি সংশ্লিষ্ট সকলেই নিজেদের জীবনের আর্থিক রোজনামচাকে সমুন্নত রাখার চেষ্টা করেন এই সনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। পরবর্তীতে এর সঙ্গে যুক্ত হয় বণিকের স্বার্থ, বিশেষ করে খুচরো ও মধ্য পর্যায়ের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হিসাবের খাতা সংরক্ষণ ও কার্যকর রাখা হতো এই সনের দিন তারিখ ও মাসের সঙ্গে মিলিয়ে। কারণ এভাবে হিসাব রাখার ফলে তাদের বছরের শেষে গিয়ে পুরো বছরের ব্যবসার দেনা পাওনার গতি প্রকৃতির কী রূপ তা বুঝতে যেমন সুবিধা হতো, তেমনি বছর শেষে গিয়ে একটা বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়ে নতুন বছরের হিসাবের খাতা খুলতে সুবিধা হতো।

পহেলা বৈশাখের যে উৎসব তার সৃষ্টির ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে রাজা-বাদশাহদের প্রাসাদে। নববর্ষ অর্থাৎ নতুন বঙ্গাব্দর জন্ম মোগল বাদশাহ আকবরের দরবারে। আকবরই এই সনের প্রবর্তক। কৃষিকাজের সুবিধার্থেই মুগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তার সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬)। প্রধানত কৃষকদের খাজনাপাতি দেয়ার সুবিধার্থে এই সনের প্রবর্তন করা হয়। এ কারণে এই সনের আরেক নাম ‘ফসলি সন’। প্রথমে এটিই প্রচলিত ছিল, পরে এর পরিচিতি দাঁড়ায় বঙ্গাব্দ নামে, যা আজও কার্যকর রয়েছে। চন্দ্রের নিয়মে প্রচলিত হিজরী সন ও সৌর নিয়মে প্রচলিত বাংলা সনের সঙ্গে সমন্বয় করে স্থানীয় মানুষের সুযোগ ও সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই সনের প্রবর্তন করা হয়। এর আগে এই অঞ্চলের মানুষেরা ঋতুভিত্তিক বিভিন্ন উৎসবের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকলেও বঙ্গাব্দ সন প্রবর্তনের মধ্যে দিয়ে বৈশাখের প্রথম দিনের উৎসব তাদের জীবনের অন্যতম আনন্দঘন দিনে পরিণত হয়।

এই দিনে কৃষাণ বধূরা আমানি উৎসব পালন করে থাকতো। মাটির কলসের ভিতর আগের রাতে চাল ভিজিয়ে কলসের মুখে আম পাতা দিয়ে বছরের প্রথম দিনে সেই পানি ঘরের চারপাশে ছিটিয়ে দেয়া হতো মঙ্গল কামনায়, বাড়ির উঠোনে দেয়া হতো আলপনা। বাঙ্গালি ব্যবসায়ীদের জীবনে হালখাতার প্রচলন শুরু হয় এই সনের বিদায়ী মাসের শেষের কয়েকদিন ও আগমনী বর্ষের শুরুর কয়েকটা দিনকে ঘিরে এবং এর মধ্যে মুখ্য হয়ে দেখা দেয় পহেলা বৈশাখের দিনটা, যা বৈশাখী উৎসব হিসেবেই সকলের কাছে পরিচিত ও বিশেষভাবে নন্দিত। হালখাতাকে ঘিরে এই যে আয়োজন ও উৎসব এটা প্রধানত ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলেও এখানে সীমিত পরিসরে সকলের অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে এবং বাস্তবিকই সেই ধরণের উপস্থিতি ঘটেও থাকে। হালখাতা যে প্রথা বা উৎসব সেটা শুরু হয়, মূলত সনাতন ধর্মের অনুসারী ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। বাঙালি সমাজে ব্যবসার গোড়াপত্তনও হয় অবশ্য এদের হাত ধরে। পরে হিন্দু-মুসলমান সকলেই ব্যবসাকে আরও সহজ, ক্রেতা-বিক্রেতা বান্ধব, এবং স্বচ্ছ ও লাভজনক করার চেষ্টার নিমিত্তে হালখাতা সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ততা ঘটিয়ে সেখানে ঈপ্সিত লক্ষ্যের প্রতি গুরুত্ব দিয়েই সেটাকে উৎসবমুখর করে তুললো এবং হালখাতা সংস্কৃতি রীতিমতো একটা অংশগ্রহণমূলক আনন্দদায়ক উৎসবে পরিণত হল। এছাড়াও গ্রামে-গঞ্জে, নদীর পাড়ে বসতো গ্রামীণ মেলা।

এই উৎসবের কেন্দ্রে অর্থনীতির যোগসূত্রতা মূখ্য হিসেবে থাকলেও এর পরিপার্শ্বকে এমনভাবে রাঙায়িত করা হল সেটা যেন অন্তরঙ্গে অর্থযোগ আর বহিরঙ্গে আনন্দযোগ হিসেবে সকলের জন্য উৎসবমুখর একটা উৎসবে পরিণত হয়, বাস্তবিকই হলও সেই মোতাবেক। সনাতন ধর্মের ব্যবসায়ীদের দেখাদেখি মুসলিম ধর্মের অনুসারী ব্যবসায়ীরাও হালখাতা কেন্দ্রিক উৎসবকে সাঙ্গীকরণ করে নিল। এই সাঙ্গীকরণ প্রচেষ্টার অংশহিসেবে কিছু জিনিস কেবল সাঙ্গীকৃত অবস্থায় থাকল না, তার আত্তীকরণও ঘটল। রমনার বটমূলে ১৩৭২ বঙ্গাব্দ থেকে পহেলা বৈশাখের উৎসবের আয়োজন করে আসছে ছায়ানট। গানে গানে তাদের যে আহবান, তা মূলত বাঙ্গালীর প্রার্থনা সঙ্গীত বিশেষ। এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ- এ গানের ভেতর দিয়ে বাঙালি প্রতি বঙ্গাব্দের প্রথম দিনে নতুন করে বাঁচতে শেখার পুণ্যমন্ত্রই উচ্চারণ করে।

রাজধানী ঢাকাতেই নয় শুধু, দেশের প্রায় সকল বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এবং গ্রাম পর্যায়ে বঙ্গাব্দ নববর্ষের প্রথম দিনে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উৎসবের আয়োজন করা হয়। কিছু কিছু জায়গায় এই উৎসবের আয়োজন এত বেশি বর্ণাঢ্য হয়ে থাকে যে তা দেখার জন্য দেশের ভেতরের এক জায়গার মানুষ আরেক জায়গায় তো যায়ই দেশের বাইরে থেকেও অনেকেই আসেন। প্রবাসী বাঙ্গালিদের অনেকেই দেশে আসার ক্ষেত্রে পহেলা বৈশাখের উৎসবে যেন শামিল হতে পারেন, নতুন প্রজন্মকে যেন পহেলা বৈশাখের বর্ণময় উৎসবের সঙ্গে পরিচিতি ঘটাতে পারেন সেদিকেও বিশেষভাবে খেয়াল রাখেন। কেননা, এই উৎসবকে ঘিরে গ্রামবাংলা ও নগর জীবন যেভাবে সাজ সাজ রবে সেজে ওঠেন তার কোন তুলনা আক্ষরিক অর্থেই হয় না।নতুন বছরের প্রথম দিন এবং বিদায়ী বছরের শেষদিনকে ঘিরে নানা ধরণের আয়োজন ছুঁয়ে যায় সকল বাঙালিকেই। বিশেষত পহেলা বৈশাখের আয়োজন বাঙালির সর্বস্তরের জনজীবনকে রাঙায়িত করে নানানভাবে। বাঙালির ঘরে, জনজীবনে এবং আর্থ সামাজিক সংস্কৃতিতে এরকম উৎসব দ্বিতীয়টি নেই। রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরের মানুষের যেমন এই উৎসবের সঙ্গে থাকে গভীর যোগসূত্রতা, তেমনই সকল সম্প্রদায়ের, জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরাও শামিল হন এখানে।

পহেলা বৈশাখমেলাসর্বজনীনহালখাতা