বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬
জীবনযাপন

ভালো থাকার মুখোশে ক্লান্ত মন—‘সবাইকে খুশি রাখা’ কি সত্যিই ভালো?

WhatsApp Image 2026-03-29 at 3.38.03 PM

সমাজে ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে পরিচিত হওয়া যেন একধরনের নীরব প্রতিযোগিতা। আমরা এমন এক সংস্কৃতিতে বড় হই, যেখানে অন্যকে কষ্ট না দেওয়া, হাসিমুখে সব মেনে নেওয়া, নিজের চাওয়া-পাওয়াকে পেছনে রাখা—এসবকেই গুণ হিসেবে শেখানো হয়। কিন্তু এই ‘ভালো থাকা’র চর্চা কখন যে নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করার অভ্যাসে পরিণত হয়, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না।

ধরা যাক, কেউ আপনাকে এমন একটি কাজ করতে বলল যা আপনি করতে চান না। কিন্তু ‘না’ বললে সে কষ্ট পাবে—এই ভেবে আপনি রাজি হয়ে গেলেন। আবার কোথাও অন্যায় আচরণ সহ্য করেও প্রতিবাদ করলেন না, কারণ আপনি ‘ঝামেলা করতে চান না’। এভাবেই ছোট ছোট আপস জমতে জমতে একসময় নিজের ভেতরের কণ্ঠটাই হারিয়ে যায়। বাইরে আপনি শান্ত, ভদ্র, হাসিখুশি—ভেতরে জমে থাকে অপ্রকাশিত রাগ, হতাশা আর ক্লান্তি।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রবণতাকে বলা হয় ‘people-pleasing’। অর্থাৎ, অন্যের সন্তুষ্টিকে নিজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। প্রথমদিকে এটি সম্পর্ক রক্ষা বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য উপকারী মনে হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব হতে পারে গভীর ও জটিল।

আমাদের শরীর কখনোই মনের চাপকে অগ্রাহ্য করে না। আপনি যদি বারবার নিজের অনুভূতিকে চেপে রাখেন, শরীর সেটাকে ‘স্ট্রেস’ হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে শরীরের ভেতরে একধরনের সতর্ক সংকেত চালু হয়ে যায়। স্ট্রেস হরমোন যেমন কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন বেশি পরিমাণে নিঃসৃত হতে থাকে। অল্প সময়ের জন্য এগুলো আমাদের টিকে থাকতে সাহায্য করলেও, দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থায় থাকলে তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

ধীরে ধীরে দেখা যায়—ঘুমের সমস্যা, মাথাব্যথা, হজমের গোলমাল, এমনকি অকারণ ক্লান্তি। আরও গভীরে গেলে ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়ে, শরীরে প্রদাহ বাড়ে। এর ফলেই কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে, বিশেষ করে অটোইমিউন রোগ। এই ধরনের রোগে শরীর নিজেরই কোষকে শত্রু মনে করে আক্রমণ করতে শুরু করে—যা দীর্ঘমেয়াদে জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীরা এই ঝুঁকিতে তুলনামূলকভাবে বেশি। কারণ, সামাজিকভাবে তাদের শেখানো হয় সহ্য করতে, মানিয়ে নিতে, নিজের চেয়ে অন্যকে অগ্রাধিকার দিতে। ফলে অনেক নারী নিজের কষ্ট, রাগ বা চাহিদাকে প্রকাশ না করে বছরের পর বছর চেপে রাখেন। এই নীরব চাপই একসময় শরীর ও মনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।

তবে প্রশ্ন হলো—তাহলে কি ভালো মানুষ হওয়া ভুল? একেবারেই নয়। সমস্যা ‘ভালো হওয়া’তে নয়, সমস্যা তখনই যখন তা নিজের অস্তিত্বকে মুছে দেয়। নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করে অন্যকে খুশি রাখা কখনোই টেকসই নয়।

তাই কিছু ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন জরুরি। প্রথমত, নিজের অনুভূতিকে স্বীকার করতে শিখতে হবে। আপনি রাগান্বিত হতে পারেন, কষ্ট পেতে পারেন—এগুলো স্বাভাবিক। এগুলোকে অস্বীকার না করে বোঝার চেষ্টা করুন।

দ্বিতীয়ত, ‘না’ বলা শিখুন। এটি অসভ্যতা নয়, বরং আত্মসম্মানের প্রকাশ। সব অনুরোধ মেনে নেওয়া আপনার দায়িত্ব নয়।

তৃতীয়ত, আবেগ প্রকাশের স্বাস্থ্যকর উপায় খুঁজে নিন। কারও সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা, ডায়েরি লেখা, কিংবা সৃজনশীল কোনো কাজে নিজেকে যুক্ত করা—এসবই হতে পারে নিরাপদ উপায়।

সবশেষে, নিজের যত্ন নেওয়াকে অগ্রাধিকার দিন। নিয়মিত বিশ্রাম, মানসিক প্রশান্তি, প্রয়োজনে কাউন্সেলিং—এসব কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ থাকার অপরিহার্য অংশ।

আমরা প্রায়ই ভাবি, অন্যদের জন্য নিজেকে বিসর্জন দেওয়াই মহৎ। কিন্তু সত্যিকারের সুস্থতা তখনই আসে, যখন নিজের ভেতরেও শান্তি থাকে। ভালো মানুষ হওয়ার আগে, নিজের প্রতি সৎ হওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি।

কারণ, মুখে হাসি রেখে ভেতরে ভেঙে পড়া মানুষ কখনোই সত্যিকারের ভালো থাকতে পারে না।

‘স্ট্রেসভালো মানুষমুখোশসবাইকে খুশি রাখা