ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আজ: প্রাণবন্ত ও কার্যকর সংসদের প্রত্যাশা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আজ বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বসছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে যে গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নতুন সংসদ গঠনের পথ তৈরি হয়েছে, তার ধারাবাহিকতায় এই অধিবেশন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর জনগণের যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকবে নতুন সংসদের ওপর।
আইন অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যেই প্রথম অধিবেশন আহ্বান করতে হয়। অধিবেশনের শুরুতেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির ভাষণ এবং শোক প্রস্তাব গ্রহণের বিষয়ও এ অধিবেশনের কর্মসূচিতে থাকবে।
এবারের অধিবেশন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ আরও একটি কারণে। অন্তর্বর্তী সরকার গত ১৮ মাসে মোট ১৩৪টি অধ্যাদেশ জারি করেছে, যেগুলো সংসদে উপস্থাপন করা হবে। সংবিধান অনুযায়ী এসব অধ্যাদেশ প্রথম অধিবেশনে অনুমোদন না পেলে সেগুলো কার্যকারিতা হারাবে। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে কিছু নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বেশ কয়েকটি আইন হিসেবে কার্যকর হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। নতুন সংসদ সদস্যরা জনস্বার্থ বিবেচনায় প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশগুলো আইন হিসেবে অনুমোদন দেবেন—এমন প্রত্যাশা রয়েছে।
অধিবেশন শুরুর আগে বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের পৃথক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে জানানো হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে কে প্রার্থী হবেন, তা নির্ধারণের দায়িত্ব সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে বিএনপির সংসদীয় দল।
গণ–অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতির কারণে প্রথম অধিবেশনে কে সভাপতিত্ব করবেন তা নিয়ে শুরুতে কিছু জটিলতা দেখা দেয়। পরে এ বিষয়ে একটি পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্পিকারের আসন শূন্য রেখে অধিবেশন শুরু করা হবে। এরপর সংসদ নেতা কোনো জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যের নাম প্রস্তাব করবেন এবং অন্য একজন সদস্য তা সমর্থন করলে তিনি অস্থায়ীভাবে অধিবেশনের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও দেশে গণতন্ত্রকে দৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও সরকারি ও বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণে কার্যকর সংসদ সব সময় দেখা যায়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দলীয় দ্বন্দ্বের কারণে অনেক সময় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক পথে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমানে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। পুরোনো ধারার রাজনীতির পরিবর্তে তারা কার্যকর ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখতে চায়। সেই কারণে এবারের সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপি দুই–তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে সরকার গঠন করেছে, ফলে সংসদে তাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। এতে স্থিতিশীল সরকার পরিচালনা করা সহজ হবে। তবে অতিরিক্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনো কখনো ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তাই সংসদের শুরু থেকেই সরকারের দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি।
একই সঙ্গে বিরোধী দলেরও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। যুক্তিপূর্ণ আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে সংসদকে সক্রিয় ও কার্যকর করে তোলাই গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সরকারি ও বিরোধী দলের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি প্রাণবন্ত ও কার্যকর সংসদ গড়ে উঠতে পারে, যা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে আরও শক্তিশালী করবে।



