‘নারী, এবার তুমি শেকল ভাঙ্গো!’

সারাবিশ্ব যখন এপস্টিন ফাইল নিয়ে আলোড়িত, আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, এপস্টিনের মতো কুকীর্তি আমাদের দেশেও বহুদিন ধরে চলছে। ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাবের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই যৌন নিপীড়নের ধরণ আমাদের দেশে নতুন নয়, বরং নিয়মিতই। এই নিপীড়নগুলোর নায়ক কখনও আনভীরের মত ধনকুবেররা, কখনও মুরাদের মত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। আবার, কখনও পাহাড়ি অঞ্চলে “নিরাপত্তা রক্ষার” আড়ালে রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও।

ছবি: আব্দুল গনি
আমরা ভুলিনাই, মুনিয়া ধর্ষণ ও হত্যার প্রধান আসামী সায়েম সোবহান আনভীর হলেও কিভাবে অন্যায্যভাবে সেই মামলা থেকে তার অব্যাহতি হয়ে গেছে। আমরা ভুলিনাই তনুর কথা, প্রায় ১০ বছরেও যার বিচার পেলাম না। ভুলিনাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অবন্তিকা যৌন হয়রানির বিচার না পেয়ে আত্মহত্যা করে, অথচ তারপরেও প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলগুলো কার্যকর হয়না। চা শ্রমিকের মেয়ে প্রীতি উড়াং-এর মৃত্যুর মামলাতে কত সহজেই জামিন পেয়েছেন সৈয়দ আশফাকুল আলম, আমরা ভুলি নাই। ভুলিনাই ৩০ বছর পরেও আমাদের প্রশ্ন করতে হয়, ‘লেফট্যানেন্ট ফেরদৌস, কল্পনা চাকমা কোথায়?’

ছবি: আব্দুল গনি
বরং এই বিচারহীনতার সঙ্গে আরো যুক্ত হতে দেখেছি, নারী সহিংসতা কিভাবে কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে, এমনকি নির্বাচনী প্রচারণারও অংশ হয়ে উঠতে পারে নারীবিদ্বেষ! এক ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত নারী ও শিশু ধর্ষণের মামলাই দায়ের হয়েছে ৭০৬৮টি। একই সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জনসমাবেশগুলো এখন-তখন নারীবিদ্বেষী প্রচারণাতেই ব্যস্ত থাকে। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের রিপোর্টকে কেন্দ্র করে ভরা মজলিশে নারীদের ‘বেশ্যাকরণ’ এরও শিকার হতে দেখেছি আমরা। ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের সামনের কাতারে ছিলে নারীরাই। অথচ, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার আসার পরও নারীদের কাঠামোগত নিপীড়নের অংশ হয়েই থাকতে হচ্ছে, নারীবিদ্বেষ হচ্ছে নির্বাচনী প্রচারণার অংশ। এবং, আমাদের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকারমহলেরও কার্যকর কোনো অবস্থান দেখতে পাইনি। বছরের পর বছর আইনেও রয়ে গেছে ভুক্তভোগী নারীর চরিত্রহননকারী ধারা।

ছবি: আব্দুল গনি
পনেরো বছরের স্বৈরাচার পতনের পর দেড় বছর ধরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যাশা করি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আসা সরকার জনগণের স্বার্থেই কাজ করবে। যদি তাই হয়, আমরা কি প্রত্যাশা করতে পারি- নারীপ্রশ্নে ক্ষমতার চরিত্র কিংবা রাজনীতির ভাষা বদলাবে? আসন্ন নির্বাচনের প্রক্রিয়ায়- যেখানে নারীর অংশগ্রহণই প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে- সেই নির্বাচিত সরকার দ্বারা আমরা কি আদৌ নারীর অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের জায়গায় দেখতে পাবো?

ছবি: আব্দুল গনি
আজ যখন নির্বাচিত সরকার গঠনের প্রস্তুতি চলছে, তখন আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই- নারীদের বাদ দিয়ে কোনো গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব নয়। নারীবিদ্বেষ, লিঙ্গীয় ও জাতিগত বৈষম্য, ধর্মীয় নৈতিকতার নামে নারী নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি বন্ধ না হলে রাষ্ট্র বা সমাজ কোনো বদল বা সংস্কারই সম্ভব না। আমরা আশা করি, নতুন সরকার গঠনের সাথে সাথে এই ধরণের আইনসিদ্ধ নিপীড়ন, লিঙ্গীয় ও জাতিগত বৈষম্যমূলক চর্চা রাষ্ট্রকাঠামো থেকে বিলুপ্ত হবার পাশাপাশি নারীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদান নিশ্চিত হবে।
আমাদের দাবি:
১। ধর্মীয় বক্তব্যের নামে অনলাইনে ও অফলাইনে নারী অবমাননাকর বক্তব্য প্রচার বন্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২। ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (সংশোধিত) এর ১৪৬ (৩) ধারা পুনঃসংস্কার করার মাধ্যমে আইনের দিক সহ জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বয়স-লৈঙ্গিক পরিচয় নির্বিশেষে যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে যেকোনোভাবেই ‘ভিক্টিম ব্লেমিং’ (দোষারোপ করা/নিন্দা জানানো) বন্ধ করতে হবে।
৩। সায়েম সোবহান আনভীর, শাফাত আহমেদের মত শিল্পপতি-ধনকুবেরদের নারী নিপীড়নমূলক অপরাধ বিচারের আওতায় এনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে অন্যায্যভাবে খারিজ হয়ে যাওয়া মামলাগুলো পুনঃতদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪। সেনা প্রহরার পাহাড়ে নারীর উপর সংঘটিত সামরিক-বেসামরিক পুরুষদের যৌন সন্ত্রাসের খবরসমূহ গণমাধ্যমে আসার অবাধ প্রক্রিয়া নিশ্চিতকরণ, অভিযোগ যথাযথভাবে আমলে নেওয়া ও সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে পাহাড়ে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
৫। মাদ্রাসার শিশুসহ সকল শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হলে ৯০ দিনের মাঝে দ্রুততম ট্রাইব্যুনালে অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
৬। হাইকোর্টের নির্দেশানুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ সরকারি, বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতন বিরোধী সেল কার্যকর ও পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। সিডো সনদে বাংলাদেশকে স্বাক্ষর ও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।
৭। প্রাথমিক লেভেল থেকেই পাঠ্যপুস্তকে যৌন শিক্ষা (গুড টাচ-ব্যাড টাচের শিক্ষা, সম্মতি বা কন্সেন্ট এর গুরুত্ব, প্রাইভেট পার্টস সম্পর্কে অবহিত করা) যোগ করার সাথে সাথে এর কার্যকরী পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।
৮। যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের সুবিধার্থে হটলাইনের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। গ্রামীণ সালিশ/পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ধর্ষণের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
৯। কোনো নারী নিপীড়নের শিকার হলে অভিযোগ জানাতে গেলে থানা ও আদালতে পুলিশি ও অন্যান্য হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
১০। গণপরিবহনে নারীদের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে।
আমরা স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই; দিনে হোক বা রাতে, আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে, নারী হিসেবে আমাদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায় সরকারের। অপরাধ সংঘটিত হলেই “মেয়েরা এতো রাতে বাইরে কেন?” চলমান এই সামাজিক ট্যাবুর মুখ আমরা আজীবনের জন্য বন্ধ করে দিতে চাই, নারী হিসেবে সমান রাষ্ট্রীয়, নাগরিক ও সামাজিক মর্যাদা চাই।
৮ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টা ৫৯ মিনিট থেকে শুরু হবে শেকল ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আমাদের এই পদযাত্রার পঞ্চম পর্ব। শাহবাগ থেকে কলাবাগান হয়ে মানিকমিয়া এভিনিউ এর রাস্তায় আমরা হাঁটবো, গলা উঁচিয়ে প্রতিবাদ করবো, গান গাইবো, রাতের অন্ধকার ভেদ করে সবাইকে জানিয়ে দেব আমাদের দাবির কথা।

ছবি: আব্দুল গনি
নারীদের এ পদযাত্রায় অংশ নিতে পারবেন যেকোনো নারী৷ আপনি যদি লক্ষ্য করেন এই সমাজের বারংবার নারীদের নিষ্পেষিত করার প্রয়াস, আপনি যদি মুক্তি চান-স্বাধীনতা চান; একজন স্বাধীন নাগরিকের মতো অধিকার চান, এই পদযাত্রা আপনার জন্যই!
প্রস্তাবিত যাত্রাপথ: শাহবাগ-সিটি কলেজ-কলাবাগান-মানিকমিয়া এভিনিউ। মানিকমিয়া এভিনিউ এ পৌঁছে সমাবেশ এবং প্রতিবাদী অবস্থান।



