বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬
ছবির গল্প

বর্জ্যের মাঝেও রঙিন শৈশব

WhatsApp Image 2026-01-25 at 6.47.56 PM (1)

নগরের এই নদীতীর একসময় ছিল খোলা বাতাস আর জলছবির ঠিকানা। আজ সেখানে নদী আর তীর আলাদা করে চেনা যায় না—দুটোই ঢেকে গেছে নিষিদ্ধ পলিথিন, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি বর্জ্যের স্তরে। কালচে পানির গায়ে ভাসমান আবর্জনা, তীরজুড়ে অস্থায়ী বেড়া ও অবৈধ দখল, আর মাথার ওপরে উচ্চ ভোল্টেজ বিদ্যুৎ সঞ্চালন টাওয়ার—সব মিলিয়ে এলাকাটি যেন ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে এক অনিরাপদ নগরাঞ্চলে। এই বাস্তবতার মাঝেই খেলায় মেতে ওঠে কয়েকজন শিশু।

ছবি: আব্দুল গনি

শিশুদের চোখে এই জায়গা কোনো বিপদসংকুল এলাকা নয়। এটি তাদের দৌড়ের মাঠ, লাফের সীমানা, ক্ষণিকের মুক্তির ঠিকানা। তারা জানে না দূষিত পানিতে লুকিয়ে থাকা রোগজীবাণুর কথা, জানে না বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ঝুঁকি কিংবা পলিথিন ও কাচের টুকরোয় আহত হওয়ার আশঙ্কা। তারা জানে শুধু—শৈশব থেমে রাখা যায় না।

ছবি: আব্দুল গনি

কিন্তু এই দৃশ্য নিছক শৈশবের উচ্ছ্বাস নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনার এক দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। নদী দূষণ এখানে আর আলাদা কোনো পরিবেশগত ইস্যু নয়—এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্য ও শিশু নিরাপত্তার প্রশ্নে গিয়ে ঠেকে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব এবং নদীতীর সংরক্ষণে উদাসীনতার ফলে নদী তার স্বাভাবিক চরিত্র হারিয়েছে। তার সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুদের নিরাপদ বেড়ে ওঠার পরিবেশ।

ছবি: আব্দুল গনি

বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, দূষিত নদীসংলগ্ন এলাকায় বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে ত্বক রোগ, শ্বাসকষ্ট ও নানা সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। এর পাশাপাশি রয়েছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা—নদীতে পড়ে যাওয়া, বৈদ্যুতিক স্থাপনার কাছাকাছি খেলাধুলা, কিংবা বর্জ্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ধারালো বস্তুতে আহত হওয়ার সম্ভাবনা। তবু বাস্তবে এই ঝুঁকিগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে শিশুদের জন্য আলাদা কোনো নিরাপদ অবকাশ গড়ে তোলার উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়।

Advertisements
ছবি: আব্দুল গনি

নগর উন্নয়নের আলোচনায় সড়ক, সেতু ও স্থাপনার হিসাব যতটা গুরুত্ব পায়, শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার জায়গা ও দূষণমুক্ত পরিবেশ ততটাই অনুচ্চারিত থেকে যায়। ফলে শহরের প্রান্তিক এলাকাগুলোতে বেড়ে ওঠা শৈশব ক্রমেই এক ধরনের নীরব বঞ্চনার শিকার হচ্ছে—যেখানে আনন্দ আছে, কিন্তু নিরাপত্তা নেই; প্রাণচাঞ্চল্য আছে, কিন্তু ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই।

ছবি: আব্দুল গনি

বর্জ্যের স্তূপের মাঝেও রঙিন শৈশব আমাদের চোখে পড়ে বলেই হয়তো আমরা স্বস্তি পাই। কিন্তু সেই রঙ আসলে এক ধরনের সতর্ক সংকেত। এটি মনে করিয়ে দেয়—শিশুদের হাসি কোনোভাবেই ঝুঁকির সঙ্গে আপস করার লাইসেন্স হতে পারে না। নদী দূষণ রোধ, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ উন্মুক্ত স্থান নিশ্চিত করা আলাদা আলাদা উদ্যোগ নয়; এগুলো একই দায়িত্বের ভিন্ন দিক।

ছবি: আব্দুল গনি

এই শৈশব আমাদের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—আমরা কি শুধু দৃশ্য দেখে এগিয়ে যাব, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, বাসযোগ্য ও মানবিক শহর গড়ার দায় স্বীকার করায়।
শিশুর খেলার নিরাপদ আকাশ ও মুক্ত ক্রীড়াক্ষেত্র নিশ্চিত করা আমাদের কর্তব্য। কিন্তু আমরা নিজেরা কর্তব্যহীন, প্রশাসন উদাসীন, নগর পরিকল্পনাকারী উদাস্য, ব্যবসায়ী দূষণে উদাসীন, প্রতিবেশী অচেতন। এর ফলশ্রুতিতে শিশুদের শৈশব নীরব বর্জ্যের গভীরে আটকে, ঝুঁকির সঙ্গেই বসবাস করে, আর আমাদের অক্ষমতা তাদের স্বপ্নে বিষের স্বাদ ছড়ায়।আমাদের উদাসীনতার কারণে হয়তো মূল্য দিতে হবে এই শিশুদেরই।

Advertisements