Skip to content

২৮শে জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৪ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

‘বৈবাহিক ধর্ষণ’ কেন অপরাধ নয়

সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটমান সব অপরাধের মধ্যে নিঃসন্দেহে ধর্ষণ অন্যতম নিন্দনীয় এক অপরাধ। তাই বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশে রয়েছে ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইন। কখনো আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে না হলে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদে উত্তাল হয়েছে রাজপথ। তবে, এসব প্রতিবাদই হয়েছে বিবাহবহির্ভূত ধর্ষণের ক্ষেত্রে। কিন্তু বৈবাহিক ধর্ষণের বিরুদ্ধে কাউকে সরব হতে দেখা যায়নি। এখন প্রশ্ন উঠছে, বৈবাহিক ধর্ষণের বেলায় সব কেন নিশ্চুপ?

আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বামীরা নিজেদের স্ত্রীকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে দেখে। যাকে যখন খুশি, যেভাবে খুশি ভোগ-দখল করা যায়। তাদের এই স্বেচ্ছাচারিতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই বৈবাহিক ধর্ষণের মাধ্যমে। আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষের কাছে এই শব্দটি হাস্যরসাত্মক বলেই মনে হবে। অনেকে আবার জানেনই না ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’ আসলে কী?

বৈবাহিক ধর্ষণ বলতে স্বামীর এমন আচরণকে বোঝায়, যেখানে স্বামী তার স্ত্রীর অনিচ্ছাসত্ত্বেও জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। স্বামীরা ধরে নেয় এটি তাদের বৈবাহিক অধিকার। সংজ্ঞা জেনেও হয়তোবা অনেকে হেসেই উড়িয়ে দেবেন। কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। স্ত্রীর ওপর আধিপত্য বিস্তার যেন তাদের বৈবাহিক জীবনের লক্ষ্য।

বেশিরভাগ পুরুষই এ ব্যাপারটিকে ধর্ষণ বলে মানতে একদমই নারাজ। এমনকি অনেক নারীও বিষয়টিকে ধর্ষণ হিসেবে মেনে নেবেন না। আর এর পেছনের কারণ ছোটবেলা থেকে আমাদের সুস্থ মস্তিষ্কে কিছু অসুস্থ বীজ বপন করে মানসিকতায় পরিবর্তন আনা। ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের স্বামীভক্ত হওয়ার ট্রেনিং দেওয়া হয়। যেমন, বিয়ের পর স্বামীর ঘরই আসল, স্বামীর কথা শোনাই মেয়েদের একমাত্র কর্তব্য, স্বামীকে যেকোনো উপায় সুখী করাই শুধু নারীর লক্ষ্য হওয়া উচিত ইত্যাদি।

২০১৩ সালে জাতিসংঘের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, চীন, ইন্দোনেশিয়ার ২৪ শতাংশ স্বামীরা তাদের স্ত্রীর সঙ্গে জোরপূর্বক শারীরিকভাবে মিলিত হয়, যেখানে কিনা তারা স্ত্রীর সম্মতি নেওয়ার প্রয়োজনও মনে করে না। এর মধ্যে ৩৮ শতাংশ পুরুষ স্ত্রীদের শাস্তি দিতেও জোরপূর্বক মিলিত হয়। জাতিসংঘ ১০০০০-এর অধিক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ওপর এ জরিপ চালায়। ২০১১ সালে জাতিসংঘ ১২০০০ নারীর অংশগ্রহণে একটি জরিপ চালায়। যেখানে উঠে আসে ৮৭ শতাংশ বিবাহিত নারী বৈবাহিক ধর্ষণের কথা স্বীকার করে।

করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউনের সময় বৈবাহিক ধর্ষণের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। তবে বরাবরের মতোই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় আসল হিসাব। বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে মুখ খুলতে চান না নারীরাও। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু করোনার শুরুর দিকে অর্থাৎ ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে স্বামীর হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হন ৮৫ জন নারী। এই পরিস্থিতিতে স্বামীর হাতে যৌন-নির্যাতনের সংখ্যাটি তুলনামূলক-ভাবে কম হওয়ার কারণ বৈবাহিক ধর্ষণ সম্পর্কে নারীদের অজ্ঞানতা, পারিবারিক ও সামাজিক চাপ।

বাংলাদেশে দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় ধর্ষণের সংজ্ঞা দেওয়া আছে এবং ৩৭৬ ধারায় এর শাস্তির বিধান উল্লেখ করা আছে। কিন্তু হতাশাজনক বিষয় দেশের নারীরা প্রতিনিয়ত বৈবাহিক ধর্ষণের স্বীকার হলেও এ সংক্রান্ত কোনো আইন এখনো প্রণয়ন করতে পারেনি সরকার।

ধর্ষণ সংক্রান্ত ধারা দণ্ডবিধি ৩৭৫, ৩৭৬ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০’র ধারা ৯-এর কোথাও বৈবাহিক ধর্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়নি। বরং দণ্ডবিধির ৩৭৫ নম্বর ধারায় ধর্ষণের সংজ্ঞা থেকে বৈবাহিক ধর্ষণ ব্যাপারটাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

৩৭৫ ধারায় ধর্ষণের বর্ণনা দিতে গিয়ে ৫ রকম উপাদানের কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে একজন ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয় যার বয়স ১৩ বছরের কম না, সেই ক্ষেত্রে তা কখনো ধর্ষণ বলে গণ্য হবে না। সুতরাং এখানে ১৩ বা তার অধিক বয়সের স্ত্রীর সঙ্গে যেকোনো পরিস্থিতিতে এমনকি সম্মতি ব্যতিত সহবাসকে ধর্ষণ বলে গণ্য করা হচ্ছে না।

আমাদের সমাজে নারী-পুরুষ বিবাহ করার মাধ্যমে শারীরিকভাবে মিলিত হওয়ার বৈধতা পায়, এটা যেমন ঠিক; তেমনি নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছারও মূল্য রয়েছে। জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক ধর্ষণ এবং নির্যাতনের কাতারেই পড়ে, হোক সে আইনত স্বামী। প্রতিটি নারী একজন মানুষ। প্রতিটি মানুষেরই যার যার অধিকার রয়েছে, ইচ্ছার মূল্য রয়েছে।

১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ বৈবাহিক ধর্ষণকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্বের ১৯৫টি দেশের মধ্যে ১৪০টিই সংজ্ঞা পাল্টে বৈবাহিক জীবনে ইচ্ছার বাইরে সঙ্গমকে ধর্ষণ ধরে শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’কে অপরাধ বলে গণ্য করেনি। পাকিস্তানও বিয়ের পর ইচ্ছার বাইরে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করার আইন করেছে। দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় সংশোধন এনে ২০০৬ সালেই পাকিস্তানে স্ত্রীকে সঙ্গমে বাধ্য করাকে অপরাধ ধরে শাস্তির বিধান করেছে। সেখানে এই অপরাধে ২৫ বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

ইউএন উইমেন কর্তৃক ২০১৯ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিশ্বের ৫৮ শতাংশ দেশেই বৈবাহিক ধর্ষণকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হয়েছে গণ্য করা হয় না। এ ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নে এশিয়া মহাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে।

বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে আমাদের দেশের আইনের এই নিশ্চুপ অবস্থান স্বেচ্ছাচারী, প্রতিশোধপরায়ণ পুরুষতন্ত্রের সাহস কয়েকগুণ বাড়িয়ে তুলছে। দিনের পর দিন নারীর প্রতি নির্যাতন আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এর ভবিষ্যৎ ফল যে খুব একটা সুবিধার হবে না, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

অনন্যা/জেএজে