বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
সাহিত্য-সংস্কৃতি

অপার অপেক্ষা

অপার অপেক্ষা

পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিয়ের এক যুগেরও বেশি সময় ধরে স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ি থেকে অবহেলা, অসম্মান, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হবার পর শিক্ষিতা, স্বাবলম্বী, সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে অপা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল এই সংসারটা আর করবে না। ডিভোর্সের কথা স্বামীকে জানানোর সঙ্গে সঙ্গে স্বামী সম্মতি দিয়ে দেয়। পথও দেখিয়ে দেয় কীভাবে এ পথে এগোতে হবে। একদমই অবাক হয়নি অপা। স্বামীর সঙ্গে তার মানসিক দূরত্ব বহুবছরের। ভাঙা মন নিয়ে স্বামীর সংসার সাজিয়েগুছিয়ে রেখেছে বছরের পর বছর। স্বামীকেও সাজিয়েছে বারবার। কিš‘ ঐ স্বামী নামক জড়ব¯‘র কাছ থেকে কখনোই কোনো প্রশংসা জোটেনি কপালে। কোথাও বেড়াতে গেলে নিজের জন্য কিছু না কিনে ঘর সাজাবার জিনিসপত্র কিনে আনত অপা। প্রতি বছর ঈদের আগে ড্রইংরুমের নতুন পর্দা, সোফার কভার কিনত। শাশুড়ি ঈদের আগের রাতে ড্রইংরুমটাকে দেখে বলত, একদম চকচক করছে রুমটা। অপার মন আনন্দে ভরে উঠত। ঈদে সবচেয়ে দামি শাড়িটা শাশুড়ি অপার কাছ থেকেই পেত। যদিও শাশুড়ির গহনা ভাগাভাগির সময় কিছুই জোটেনি অপার ভাগ্যে। অপাকে দেওয়া হয়েছিল শাশুড়ির বিয়ের শাড়িটা। যা কি না ছিল ৫৭ বছর আগের। আর নাতি-নাতনিদের মধ্যে অপার ছেলের ভাগ্যে জুটেছিল কিছু ভাঙা গহনার সঙ্গে একটা হালকা নেকলেস। যেটা অপা সযতেœ রেখে দিয়েছে ছেলের বউকে দেবার জন্য।

শ্বশুরের সঙ্গে অপার ভীষণ ভালো সম্পর্ক ছিল। দুই-তিন ঘণ্টা একনাগাড়ে গল্প করে যেতেন তিনি অপার সঙ্গে। বারবার একই গল্প করতেন। অপা বিরক্ত হতো না। দুই জা ছিল খুব লোভী স্বভাবের। বড়ো জা আর ভাসুর শ্বশুরকে পটিয়ে এবং তাদেরকে নিয়ে একসঙ্গে থাকার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে শ্বশুরের জায়গায় তার ভাগটা নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছিল। ছোটো জা একদিন অপাকে বলেছিল, তোমার সঙ্গে বাবার এত ভালো সম্পর্ক, তুমি বাবাকে প্রপার্টি ভাগ করে দেবার কথা বল। নির্লোভ অপা ওর প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। শ্বশুরও বাকি তিন ছেলেমেয়েকে বাদ দিয়ে শুধু মাত্র বড়ো ছেলেকে তার সম্পত্তির অংশ বুঝিয়ে দিয়েছেন। কেন দিয়েছেন জানা হয়নি, তবে ছেলের সেই জায়গার বাড়িতে শ্বশুর-শাশুড়ির ঠাঁই হয়নি।

পরিবারের বা”চারা অপাকে খুব পছন্দ করত। ওদের নানারকম আবদার থাকত অপার কাছে। চাচা শ্বশুর-শাশুড়ি, ফুপা শ্বশুর-শাশুড়ি যারা ওর প্রতিবেশী ছিলেন ভালো কিছু রান্না হলে অপাকে ছাড়া খেতেন না। অপাও আপ্যায়ন করতে খুব ভালোবাসত। ও বাড়িতে এমন কিছু আতœীয় ছিল যারা কি না অপা যাবার পর ঐ বাড়ির খাবার খেয়েছে। চাচাতো-ফুপাতো দেবর-ননদ, ননাসসহ প্রতিবেশীরা বলত, অপা তার যোগ্য স্বামী পায়নি। অপার কষ্টটা সবাই বুঝত একমাত্র নিজের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ছাড়া। মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ওরা ঐ বাড়িতে অপার জীবন শুরু করিয়েছিল। একমাত্র স্বামীকে ভালোবেসে মুখ বন্ধ করে সবকিছু মেনে নিয়েছিল অপা। যদিও মিথ্যা প্রকাশ হবার পর অপার বাবার বাড়ি থেকে দু-দুবার অপাকে চলে আসতে বলা হয়েছিল। আসেনি অপা।

খুব সুন্দর বাগান ছিল শ্বশুরবাড়িতে। অপারও খুব বাগান করার শখ ছিল। ওর বাগানে নানারকম ফল, ফুল, সবজি হতো। প্রতি বছর শীতের সময় বহুদূরে নার্সারি থেকে ওরা অনেক ফুল-সবজির গাছ কিনে এনে লাগাত। অনেকে ছবি তুলতে আসত ওদের বাগানে। ওখানে অপা ছেলেকে নিয়ে চমৎকার সময় কাটাত। মা ছেলেকে নিয়ে বিকালে বাগানে হেঁটে হেঁটে ছেলের জেনারেল নলেজ পড়া কমপ্লিট করে ফেলত। ফুলের সঙ্গে কথা বলত। ছেলে উড়ে বেড়ানো প্রজাপতির পিছন পিছন দৌড়ে বেড়াত। একটা জার্মান শেফার্ড ছিল ওদের। ছেলের খেলার সাথি ছিল। বাগানের শেষ প্রান্তে দেয়ালের সঙ্গে লাগোয়া অনেক সুপারিগাছ ছিল। মন খারাপ করা দিনগুলোতে ঘরের জানালার গ্রিলের মাঝ দিয়ে সুপারিগাছের মাথার ওপরের আকাশটাকে অনাত্মীয়ের ঐ শহরে অপার একমাত্র আপনজন বলে মনে হতো। ঐ একফালি আকাশে মন খারাপ করা কালো মেঘের আনাগোনা দেখতে দেখতে কতবার ভেবেছে, ওদের বাড়ি কোথায়? কোথায় যা”েছ ওরা? কেন ওদের মন খারাপ। কখনো কখনো কালো মেঘের সঙ্গে নিজের মনের অব¯’ার মিল খুঁজে বেড়িয়েছে হতভাগী অপা।

চরম অশান্তির সংসারে স্বামী বাসায় এলে অপা টেবিল ভরে রান্না করত। স্বামীর টান ছিল অন্য কোথাও। দিনের পর দিন কথা বন্ধ থাকত ওদের। এমন করতে করতে একসময় ‘শুভ সকাল’, ‘শুভ রাত্রি’তেই শেষ হয়ে যেত ফোনালাপ। ছেড়ে আসার পর স্বামী লিখেছিল, দিনের পর দিন কথা বন্ধ করে না রেখে যদি ঝগড়া করে সব মিটিয়ে ফেলতাম তাহলে আজ এমন দিন দেখতে হতো না। লেখাটা পড়ে অপা কেঁদেছিল আর ভেবেছিল, বড় বেশি দেরি করে ফেলেছে।

অপার ছেলের বয়স ১৫ বছর। ছেলে অপার সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিল। ছেলে আসতে না চাইলে অপা কখনোই ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিত না। একদিন অপা সত্যি সত্যিই প্রচÐ অভিমান নিয়ে সবকিছু ছেড়ে চলে এলো।

তিক্ত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অপা শুধুমাত্র একটু সম্মানের আশায় শুরু করে নতুন জীবন। এ সংসারে মা হারা দুই বা”চা। ওরা বড় হয়ে গেছে। নিজেদের সবকিছু বুঝে নিতে শিখে গেছে। এখন অপার তিন ছেলেমেয়ে। অপার ছেলেই ছোটো। ছেলেকে স্বামীর সহায়তায় ভালো স্কুলে ভর্তি করে। অপার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হলেও ছেলেকে নিয়মিত বাবা, দাদা-দাদি, চাচা-ফুপুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে দিয়েছিল অপা। ছেলে বাবার সঙ্গেও নিয়মিত দেখা করত। বাবার বাসায় ছুটিতে গিয়ে থেকে আসত। ভালোই চলছিল সব। একবছর পর হঠাৎ একদিন সকালে ছেলে গেল বাবার সঙ্গে দাদাবাড়িতে যাবার কথা বলে। সন্ধ্যায় ফোন করে বলল, এখন থেকে ও বাবার সঙ্গে থাকবে। প্রচÐ ধাক্কা খেল অপা। মেনে নিতে পারেনিÑওরকম দায়িত্বজ্ঞানহীন পাষাণ মানুষটার কাছে বা”চাটা থাকবে কীভাবে।

অপার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ছেলেকে ড্রইংরুমে থাকতে দেওয়া হয়েছে। অপা আগেই জানতে পেরেছিল এক্স শ্বশুরবাড়ি থেকে ছেলেকে নানাভাবে বোঝানো হ”েছ এখান থেকে চলে যাবার জন্য। বিশ্বাস করেনি ছেলে চলে যাবে। অপা একেবারেই ভেঙে পড়ল। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গেল। চিকিৎসা নিয়ে কোনোরকম জীবন যাপন করতে থাকল। ছেলে চলে যাবার পর অপা একটু একটু করে আবিষ্কার করতে থাকল, ওর আসলে কোথাও কেউ নেই। ও একেবারে একা। প্রতিদিন ভাবতে থাকল কোথায় কোথায় ভুল ছিল ওর। ছেলেটা কেন চলে গেল। অনেক কিছু সামনে চলে এলো। কোনো সময় বা”চাদের মধ্যে বিভেদ করেনি অপা। মনে হতে থাকল যদি নিজের ছেলেকে একটু বেশি আদর করত তাহলে হয়তো ছেলেটা চলে যেত না। ওর বিবেক ওকে ঐ বিভেদটা করতে দেয়নি। ছেলে প্রায়ই বলত, তুমি আর আগের আম্মু নেই। ছেলে আর অপার সংসারে অপা ছিল শুধুই ছেলের। এখানে এসে অপার বহুভাগে ভাগ হওয়াটা বা”চা ছেলেটা মেনে নিতে পারেনি। প্রচÐ ম্যানেজেবল হওয়ায় ও মানাতে চেষ্টা করেছিল খুব। অপা বুঝতে পারে এখানে একদিকে স্বা”ছন্দ্যের অভাববোধ, মায়ের শাসন অন্যদিকে প্রচÐ স্বাধীনতার আশ্বাস ছেলেটাকে মাসের পর মাস অ¯ি’র করে তুলেছিল। একসময় বা”চা ছেলেটা মায়ের সঙ্গে সমস্ত বাঁধন ছিঁড়ে হয়তো প্রচÐ অভিমান নিয়ে বাবা এবং অসম্ভব স্বার্থপর, অর্থপিচাশ আতœীয়দের কাছে চলে গেল।

এ বাসার সবকিছুর সঙ্গে ওদের অ্যাডজাস্ট করতে হয়েছে। মানিয়ে নেওয়া আর মেনে নেওয়া বোধহয় এক না। ওরা দুজনের কেউই অনেককিছু মেনে নিতে পারেনি। কিছু কিছু কথা মনের মধ্যে উঁকি দিয়ে গেল। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে চোখের জলে সিক্ত হলো অপা।

অপার নিরানন্দময় জীবনটা এখন চলছে একঘেয়ে ঘড়ির কাঁটার মতো। দিনের পর রাত আসে, রাতের পর দিন। ছেলেকে ভোলার জন্য নানান কাজে ব্যস্ত হয়ে যায় অপা। এক মুহূর্তের জন্যও ছেলেকে মন থেকে সরাতে পারে না। ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে কাটে নির্ঘুম রাত। ছেলেটাও একা একা থাকে। হাসে না। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করে না। নিজের সব কাজ ওর নিজেরই করতে হয়। যা কি না আগে অপাই সব করে দিত। মায়ের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত ছেলেটার কথা চিন্তা করতে করতে অপা ভাবে ওর জীবনের পুরাটাই হয়তো কষ্টে ভরা। অপার নিজের ওপর ঘৃণা হয়।

বড়ো বেরঙিন হয়ে আসতে থাকে অপার সকালগুলো। বাড়িতে নিজেকে চার দেয়ালের মাঝে বন্দি করেছে অপা। প্রয়োজন ছাড়া খুব একটা কথা বলতে ই”েছ হয় না কারো সঙ্গে। হাসে না। ই”েছগুলো ঘুড়ি হয়ে আকাশে উড়ে গেছে সেই কবে। রান্না করতে গেলে মনে হয় ছেলেটা ওদিকে কী খা”েছ। ঘর আর নতুন পর্দা, ফুল দিয়ে সাজানো হয় না। অপার বাড়ির বারান্দায় রোদ আসে না। বারান্দায় ফুল দেখা হয় না বছর কয়েক হতে চলল। শুচিবায়ুতা বেড়েছে, বেশ বুঝতে পারে। ঘড়ির কাঁটা ধরে চলা অপার জীবনে বারবার হতে থাকে ছন্দপতন। প্রতি মুহূর্তে যুদ্ধ করে মাথা উঁচু করে বাঁচবার মেয়ে অপার সবধরনের দক্ষতার অপমৃত্যু হয়েছে যেন। নিজেকে বড়ো অসহায় মনে হয়। নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখা হয় না। এড়িয়ে চলে অনেককিছু। সবার কাছে হয়তো অপার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। শুধুমাত্র যার খুব দরকার, অপা তার কাছে যেতে পারে না। পায়ে বেড়ি পরানো। অপেক্ষা করে থাকে কবে ছেলে বড়ো হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে। ওকে কি ঘৃণা করবে, না ওর কষ্টটা বুঝবে। অসম্ভব স্বার্থপর এই পৃথিবীর মানুষগুলোর নিচুতা, দীনতা ওকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় অতীতে…

আহত পাখির মতো ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে এক একটা দিন পার করে অপা। প্রতিনিয়ত অপেক্ষা করে থাকে ছেলের মুখের একচিলতে হাসি দেখবার জন্য।