বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬
স্পটলাইট

সামাজিক নিরাপত্তা ও নারীর মর্যাদা : বিধবা ভাতা কর্মসূচির বাস্তব চিত্র

94db508819236645800e554eb7dcddca~2

সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচির কার্যকারিতা নিরূপণ ও সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ একজন পেশাদার সমাজকর্মীর অন্যতম দায়িত্ব। সে লক্ষ্যেই ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাসিক পরিদর্শনসূচি অনুযায়ী কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলা পরিদর্শন করা হয়। এ উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সমাজকল্যাণ কর্মসূচির সুবিধাভোগীদের অংশগ্রহণে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে আয়োজিত সভায় জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা, স্থানীয় সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় একজন বয়স্ক ভাতাভোগী বলেন, “এই ভাতা শুধু অর্থ নয়, বৃদ্ধ বয়সে এটি আমাদের আত্মসম্মানের প্রতীক।”

সভায় উপস্থিত বহু বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারী একই ধরনের অনুভূতি প্রকাশ করেন। তারা জানান, কুলিয়ারচর উপজেলায় প্রকৃত চাহিদার তুলনায় ভাতার বরাদ্দ অপ্রতুল। ফলে অনেক যোগ্য নারী এখনো এ সহায়তার বাইরে রয়ে গেছেন।

সভায় একপর্যায়ে কয়েকজন বিধবা ও পরিত্যক্ত নারী তাঁদের ভাতার বহি প্রদর্শন করে আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “এই বহিই আমাদের জমির দলিল, আমাদের শেষ ভরসা।”

এই বক্তব্য থেকেই সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচির সামাজিক ও মানসিক প্রভাব স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায়।

বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় নারীরা এখনো কাঠামোগত বঞ্চনার শিকার। জীবনচক্রের বিভিন্ন ধাপে তারা নানাবিধ সংকটের মুখোমুখি হন। বিবাহিত জীবনে স্বামীর মৃত্যু ঘটলে একজন নারী ‘বিধবা’ হিসেবে পরিচিত হন—যা কেবল একটি পারিবারিক পরিবর্তন নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। স্বামীহারা জীবন একজন নারীর জন্য নিঃসঙ্গতা, নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার সূচনা করে।

অন্যদিকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ‘স্বামী পরিত্যক্তা’ নারীর অবস্থান আরও করুণ। এরা তালাকপ্রাপ্ত নন, অথচ স্বামী দীর্ঘদিন অনুপস্থিত বা দায়িত্বহীন। স্বামী নিরুদ্দেশ থাকলেও সামাজিক ও আইনি দায়ভার বহন করতে হয় স্ত্রীকেই। ফলে এ নারীরা পরিবার ও সমাজে চরম অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৫২.৭৩ লাখ বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারী রয়েছেন, যা মোট বিবাহিত নারী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯.৫ শতাংশ। গত চার বছরে এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক পরিসরেও চিত্র ভিন্ন নয়। দ্য লোম্বা ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৫.৮ কোটি নারী বৈধব্য জীবনে বসবাস করছেন।

বাংলার মুসলিম সমাজে বিবাহকে স্থায়ী ও পবিত্র বন্ধন হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাস্তবে নারীর সামাজিক মর্যাদা অনেকাংশেই নির্ভর করে স্বামীর অবস্থান ও সামর্থ্যের ওপর। স্বামীর মৃত্যু একজন নারীর জীবনে অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনে। জীবনের অন্যান্য দুর্যোগে দাম্পত্য সম্পর্ক পারস্পরিক সহায়তার ভিত্তি হলেও, বিধবা বা পরিত্যক্ত নারীর ক্ষেত্রে সেই আবেগীয় আশ্রয় অনুপস্থিত থাকে।

বিশ্বব্যাপী বিধবা নারীদের দুটি সাধারণ সংকট সর্বাধিক প্রকট—সামাজিক মর্যাদা হ্রাস এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা। বাংলার সমাজে এর সঙ্গে যুক্ত হয় লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের নতুন মাত্রা। পরিবার পরিচালনা, সন্তান লালন-পালন, উত্তরাধিকার বঞ্চনা এবং সামাজিক অপমান—সব মিলিয়ে বিধবা ও পরিত্যক্ত নারীর জীবন হয়ে ওঠে জটিল ও সংকটাপন্ন।

‘নাগরিক উদ্যোগ’ নামক একটি সামাজিক সংগঠনের গবেষণায় দেখা যায়, স্বামীর মৃত্যুর পর ৫৬ শতাংশের বেশি নারী শ্বশুরবাড়ি থেকে কোনো সহায়তা পান না। আর্থিক দুর্বলতার কারণে দুই-তৃতীয়াংশ বিধবা নারী পিতৃপরিবার থেকেও সহায়তা বঞ্চিত হন। স্বামী পরিত্যক্ত হওয়ার পেছনে বহুবিবাহ একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—এই নির্দোষ নারীরা সামাজিক অপবাদ ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। যুবতী বিধবাদের ‘অপয়া’, ‘অলক্ষী’ ইত্যাদি কটূক্তিতে চিহ্নিত করা হয়। গ্রামবাংলার কিছু প্রবাদ নারীর প্রতি সমাজের নির্মম দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন, যেখানে নারীর জীবনকে সম্পদের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের অসহায় ও নিগৃহীত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় অধিদপ্তর দেশব্যাপী প্রায় অর্ধশত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে ‘বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত দুস্থ মহিলাদের ভাতা’ কর্মসূচি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা উদ্যোগ।

২০২৫–২৬ অর্থবছরে এ কর্মসূচির আওতায় ২৯ লাখ নারীকে মাসিক ৬৫০ টাকা হারে ভাতা প্রদান করা হবে, যার জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২২৭৭.৮৩ কোটি টাকা। এই সহায়তা নারীদের ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা ও মানসিক শক্তি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে বাস্তবতা হলো—চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ এখনো অপর্যাপ্ত। বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের টেকসই পুনর্বাসনের জন্য কেবল ভাতা নয়, প্রয়োজন কর্মসংস্থান, মানসিক সহায়তা, আইনি সুরক্ষা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। পুনঃবিবাহ একটি সম্ভাব্য সমাধান হলেও সামাজিক বাস্তবতায় তা এখনো জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়।

নারীরা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্ত পরিচয় কোনো নারীর অপরাধ নয়। বরং মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব। কল্যাণমূলক কর্মসূচির বিস্তৃতি, গবেষণাভিত্তিক নীতি প্রণয়ন এবং সহনশীল সামাজিক আচরণই পারে এই নারীদের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালাতে।