বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬
নারী

‘দ্য টার্মিনেটর’ থেরেসা: সাড়ে তিন হাজার বাল্যবিবাহের বিনাশকারী

সংগৃহীত

আফ্রিকার ছোট্ট দেশ মালাউই। সেখানে এক নারীর নাম উচ্চারণ করা হয় শ্রদ্ধা, সাহস আর আশার প্রতীক হিসেবে। তিনি ছিলেন চিফ থেরেসা কাচিন্ডামোতো—যাকে অনেকে ডাকতেন ‘দ্য টার্মিনেটর’ নামে। তবে তার এই পরিচয় কোনো ধ্বংসের জন্য নয়, বরং হাজারো কিশোরীর জীবন থেকে শিশুবিয়ে নামের অভিশাপকে চিরতরে দূর করার জন্য।

ইউএনডিপির (জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি) তথ্য অনুযায়ী, মানব উন্নয়ন সূচকে ১৮২টি দেশের মধ্যে ১৬০তম অবস্থানে থাকা মালাউই বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং দেশটির ৫০.৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে।

মালাউইতে প্রতি দুই জন মেয়ের মধ্যে একজনকে ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে এই দক্ষিণ আফ্রিকান দেশটি বিশ্বব্যাপী সর্বোচ্চ বাল্যবিবাহের হারের ২০টি দেশের মধ্যে অষ্টম স্থানে রয়েছে। তাই সন্তান লালন-পালন করা একটি কঠিন কাজ। যেখানে বেশিরভাগ মেয়েকেই খামারে কাজ করার জন্য স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়, সেখানে বাবা-মায়ের আর্থিক বোঝা কমানোর জন্য অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়।

এটি রীতিমত একটি প্রথায় পরিণত হয়। স্থানীয় সর্দার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা এই প্রথায় সম্মতি দিয়েছেন। সাত বছরের মতো কম বয়সী মেয়েদেরও জোর করে এমন শিবিরে পাঠানো হয়, যার উদ্দেশ্য হলো তাদের ‘শুদ্ধ’ করা এবং হবু স্বামীদের আরও ভালোভাবে সেবা করার জন্য প্রস্তুত করা। এর মধ্যে রয়েছে উত্তেজক নৃত্য পরিবেশন এবং যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া। কিছু ক্ষেত্রে, মেয়েদের উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য শিক্ষকের সঙ্গে যৌনমিলন করতে হয়। যারা কুমারী থাকা অবস্থায় শিবির ছেড়ে যায়, তাদের বাবা-মায়েরা তারা যা শিখেছে তা পরীক্ষা করার জন্য সম্প্রদায়ের কোনো পুরুষ সদস্যের সঙ্গে তাদের যৌনমিলনের ব্যবস্থা করে।

এই বাস্তবতারই মুখোমুখি হয়েছিলেন থেরেসা ইঙ্কোসি কাচিন্দামোতো। প্রথাগত নেতা হিসেবে নিজের ক্ষমতাকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে। পরিবার, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং সমাজের রক্ষণশীল অংশের বিরোধিতা উপেক্ষা করে তিনি একের পর এক শিশুবিয়ে বাতিল করতে থাকেন। তার উদ্যোগে মালাউইতে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি শিশুবিয়ে বন্ধ হয় এবং হাজারো কিশোরী আবারও ফিরে যেতে পারে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে।

থেরেসা বিশ্বাস করতেন, একটি মেয়ের হাতে বই তুলে দেওয়া মানে শুধু তার ভবিষ্যৎ নয়, পুরো সমাজের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া। তাই তিনি স্থানীয় পরিবারগুলোকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন—অল্প বয়সে বিয়ে নয়, মেয়েদের শিক্ষা ও স্বপ্নই হওয়া উচিত তাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। তার এই প্রচেষ্টা শুধু শিশুবিয়ে রোধ করেনি, বরং দারিদ্র্য, কিশোরী মাতৃত্ব এবং লিঙ্গবৈষম্যের চক্র ভাঙতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

২০২৫ সালে থেরেসা কাচিন্ডামোতো পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও তার কাজ আজও অসংখ্য মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে আছে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, পরিবর্তন আনতে সব সময় বড় কোনো পদ বা বিপুল সম্পদের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন সাহস, দৃঢ়তা এবং মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার অদম্য ইচ্ছাশক্তি।

আফ্রিকাথেরেসাদ্য টার্মিনেটরবাল্যবিবাহ