বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬
সাহিত্য-সংস্কৃতি

কাল থেকে কালান্তরে সমাজের চোখে নারী : পরিপ্রেক্ষিত বাংলা প্রবাদ-প্রবচন

কাল থেকে কালান্তরে সমাজের চোখে নারী : পরিপ্রেক্ষিত বাংলা প্রবাদ-প্রবচন

সমাজবিধি, মানুষের জীবনযাপন, সামাজিক রীতি-নীতি, রোগ-শোক, চাষাবাদ, নারী-পুরুষ, পিতা-মাতা-সন্তান প্রভৃতি বিষয়ে সমাজের মানুষের চিন্তা-চেতনা-ভাবনা-অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সে সমাজের ধারণাই লোকসাহিত্যে প্রবাদ ও প্রবচন হিসেবে অভিহিত হয়েছে। প্রবাদ-প্রবচনে নির্দিষ্ট ভুখন্ডের সকল মানুষের উপর্যুক্ত বিষয়-ভাবনার বহু প্রাচীন প্রকাশ। সেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচিত্র সম্পর্ক ও নর-নারী বিষয়ে যে বিবিধ ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে সেসব থেকে সমাজব্যবস্থা, সমাজে নারী-পুরুষের সম্পর্ক, সম্পর্কভেদে সমাজে নারী-পুরুষের অবস্থান, ধর্ম-বর্ণ-গোত্রে বিভক্ত সমাজে জাত-পাতের গুরুত্ব সম্পর্কে সমাজের যে চিন্তাচেতনার প্রকাশ ঘটেছে তা আয়নার সামনে দাঁড়ানো সমাজচিত্রের প্রতিবিম্ব। প্রবাদ-প্রবচনে বিচিত্র বিষয়-কেন্দ্রিক ভাবনাচিন্তা প্রকাশ পেলেও আলোচ্য প্রবন্ধে বাংলা প্রবাদ ও প্রবচনে নারী বিষয়ক যে ভাবনাচিন্তা প্রকাশ পেয়েছে তা বিশ্লেষণ করে নারী সম্পর্কে বাঙালির চিন্তাচেতনার স্বরূপ সন্ধানের প্রয়াস করা হয়েছে।

সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের গতিতে মানুষের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। সম্পর্কের মাত্রা বা নাম অনুসারে তাদের অবস্থান ও গুরুত্ব ভিন্ন ভিন্ন। সম্পর্কভেদে পুরুষ, পিতা-স্বামী-সন্তান-জামাতা-শ্বশুর-চাচা-মামা ইত্যাদি। একইভাবে নারী, জননী-কন্যা-চাচি-মামি-বধূ-পুত্রবধূ-ফুপু-খালা আবার শাশুড়িও। যত সম্পর্কে নারী সম্পর্কিত হোক না কেন সমাজে নারীর অবস্থানের খুব বেশি ফারাক হয় না; নারী মূলত দাসী এবং পুরুষনির্ভর। আর পুরুষের ক্ষেত্রে সম্পর্ক যাই হোক পুরুষ তো পুরুষ, সে সোনার আংটি। আর ‘সোনার আংটি বাঁকাও ভালো’। কিন্তু নারী মূল্যায়িত হয় সম্পর্কভেদে, বয়সভেদে, শারীরিক সৌন্দর্য ও শক্তি অনুসারে, পিতা বা স্বামীর আর্থিক ও সামাজিক অবদানভেদে, বৈবাহিক অবস্থার ভিন্নতায়, তার ধৈর্যে, নমনীয়তায়, চারিত্রিক সততায় ও দৃঢ়তায়, জাত-পাতের ভিন্নতায়। সংসারে জননী আর স্ত্রী সমভাবে মূল্যায়িত নয়, কন্যা এবং পুত্রবধূও আলাদা, মাসি-পিসিও আলাদা এমনকি ছেলের শাশুড়ি আর মেয়ের শাশুড়ির সামাজিক অবস্থানও ভিন্ন। যুগ যুগ ধরে এই বিভাজন সমাজে বিদ্যমান। তবে মাতৃতান্ত্রিক সমাজে নারী মূল্যহীন ছিল না। নারীর হাত ধরে কৃষিব্যবস্থার প্রবর্তন, প্রচলন আর তখন নারীই ছিল সমাজের চালিকাশক্তি।

কিন্তু পরিবার প্রথা প্রচলিত হওয়ার পর থেকে নারী সন্তান জন্মদান ও সংসারের কাজ নির্বাহ করার সূত্রে গৃহাবদ্ধ হয়ে মূল্য হারাতে শুরু করে। শারীরিক শক্তির উপর নির্ভর করে নারী-পুরুষের অবস্থান নির্ধারিত হওয়ায় সমাজে নারী ক্রমেই মূল্যহীন হয়ে পড়ে। নারী যেহেতু সন্তানধারণ করে তাই প্রকৃতিগতভাবে নারীর শারীরিক গঠন কোমল, পেশিশক্তি পুরুষের তুলনায় কম। আবার সন্তানধারণের জন্য গর্ভবতী অবস্থায় নারী কঠিন কাজ করতে পারে না এবং সন্তান জন্মদান ও তাদের লালন-পালনে তাদেরকে ঘরে বেশি সময় দিতে হয় সে কারণে তারা শুধু শক্তিহীন নয় গৃহবন্দিও বটে। আর সেই সুযোগে পুরুষ নারীর স্থলাভিসিক্ত হয়েছে। পেশিশক্তির যুগ শেষ হয়ে মেধা-মনন-প্রজ্ঞার যুগে নারী তার মেধার-প্রজ্ঞার প্রমাণ রাখলেও পুরুষ নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে নারীকে যথার্থভাবে সামনে এগোতে দেয়নি। অর্থাৎ সময়ের পরিবর্তনে নানাবিধ পরিবর্তন ঘটলেও নারী সম্পর্কে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চিন্তার খুব একটা উন্নয়ন হয়নি।

এখনো সমাজ পুরুষশাসিত, নারী সেখানে দুর্বল, অবলা এবং অসতী। শুধু তাই নয় নারী কর্ত্রী নয়, পুরুষের অধীন কর্মী। বাংলা প্রবাদ-প্রবচনে একটুখানি সচেতন দৃষ্টি রাখলেই সমাজের নারীভাবনার স্বরূপ অনুধাবন খুব সহজ। নারী বুদ্ধিমতী হলে পতিতা, নির্বোধ হলে ন্যাকা, মুখরা বা শক্তিশালী হলে পুরুষালি, কমজোর হলে অক্ষম। এককথায় সমাজের কাছে নারী হলো, ‘যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা’। নারীকে হেয় করে দাবিয়ে রাখতে চায় পুরুষ তাই নারী যাই করুক না কেন, যেমন স্বভাবের হোক না কেন সে সমাজের কাছে সে মন্দ, দোষী।

সমাজে নারী ‘মানুষ’ পদবাচ্যেরই শুধু নয়, প্রাণীর চেয়েও নারীর মূল্য কম। শুধু মূল্যহীন নয় সে আসলে দুর্ভাগ্যের প্রতীক। পুরুষের স্ত্রী-বিয়োগ সমাজের কাছে সৌভাগ্যের স্মারক আর গবাদিপশুর মৃত্যু দুর্ভাগ্যের স্মারক। কারণ ঐ প্রাণীটা সমাজের কাছে সম্পদ বিধায় ওটার মৃত্যু আর্থিক ক্ষতির কারণ। আর স্ত্রী হলো বোঝা, বড়োজোর দাসী-বাঁদি। বউ মরলে বউ মেলে, গরু তো মেলে না। আবার আনকোরা বউও পাওয়া যায় সে তো পরম সৌভাগ্যের বিষয়, ‘অভাগার গরু মরে, ভাগ্যবানের মাগ মরে’। একইভাবে ‘বউ গেলে বউ মেলে, ভাই গেলে ভাই মেলে না’। বউ পরের মেয়ে এবং সস্তা, আর ভাই আপন এবং দামি।

সমাজের কাছে নারী কখনো বিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারেনি। পুরুষ নারীর পরিচালক হওয়া সত্তে¡ও নারী অবিশ্বাসী, কুলটা। তারা পুরুষের দাঁড়ি, নদী, নদীর তীরবর্তী বাড়ি এবং শিংধারী প্রাণীর সঙ্গে তুলনীয়। এগুলোর মতো নারীও যে কোনো মুহূর্তে রূপবদল করে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাদের অন্তরের কথা নাকি স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও পড়তে পারে না। তাদের চারিত্রিক স্থিতিশীলতা আছে বলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ স্বীকার করে না। কখন নদীর জল কমে কখন বাড়ে, কখন ক‚ল ভাঙে, তার বক্ষদেশে কী জলজ প্রাণী আছে কিছু জানা যায় না। একইভাবে শিংওয়ালা প্রাণীও যে কোনো মুহূর্তে আক্রমণ করে বসতে পারে, নারীও তেমন, ‘হিন্দুর দাঁড়ি, মুসলমানের নারী, গাঙের ক‚লে বাড়ি, বনে চরা গাই :/ এ চারে বিশ্বাস নাই’ অর্থাৎ হিন্দুর দাঁড়ি যে কোনো মুহূর্তে কাটা পড়তে পারে, মুসলমানসমাজে নারীকে যখন-তখন তালাক দেওয়া যায়, সে পুনরায় বিয়েও করতে পারে, বনে চরে বেড়ানো গাভী যে কোনো ষাঁড়ের সঙ্গে মিলিত হতে পারে, সমাজের কাছে নারীও তেমন, ‘নদী নারী শৃঙ্গধারী, এ তিন না বিশ্বাস করি’।

রামায়নের সীতা থেকে যে অবিশ্বাসের শুরু আজও তা বহমান।

পুরুষের ক্ষেত্রে অসততার কোনো বালাই নেই। ‘সতী’ বা ‘সতীত্ব’ নিত্য স্ত্রীবাচক শব্দ, পুরুষের সতীত্ব প্রকাশক কোনো শব্দ আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি, তারা সদা সৎ, চরিত্রবান। পুরুষ এক গন্ডা স্ত্রী রাখলে কিংবা বিবাহ-বর্হিভূত দশটা সম্পর্কে জড়ালেও তার চরিত্র নষ্ট হয় না। অন্যদিকে নারী নদীর ক‚লে, পুকুরঘাটে জল আনতে গেলেও তার সতীত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে সমাজ কুণ্ঠিত নয়। শুধু তাই নয়, অন্তঃপুরবাসিনী নারীকে আমৃত্যু তার সতীত্বের প্রমাণ দিয়ে যেতে হয়। সীতা রাজসুখ ত্যাগ করে স্বামীর সঙ্গে সন্ন্যাসিনীর জীবনযাপন করেও সতীত্বের পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন। প্রতিটি নারী নিজের ভোগ-বিলাস ত্যাগ করে স্বামী-সন্তান-সংসারের জন্য জীবনপাত করার পরও তার চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যায়, ‘পুড়ল মেয়ে উড়ল ছাই,/ তবে তার গুন গাই’। সমাজের কাছে নারী এতটাই পাপিষ্ঠা যে মৃত্যুর পর তার দেহ আগুনে পুড়ে ছাই হওয়ার পর কেবল তার গুণ সম্পর্কে, চরিত্র সম্পর্কে স্থিতিসিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়।

নারীর নিজস্ব শক্তিমত্তা বলে কিছু নেই। পিতা, স্বামী বা পুত্র নির্ভর জীবন তার। সে যে স্বতন্ত্র কোনো সত্তা, সেটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ গোড়া থেকেই মানেনি, আজও মানে না, মানতে রাজিও নয়। টাকা-পয়সা, ধন-দৌলতের মতো নারীও পুরুষের আওতাধীন। স্বামী বা পুরুষ যদি নারীকে স্বীকার করে তবে সে আছে, নচেৎ নয়। আবার পিতা বা স্বামী যদি সম্পদশালী হয় তবে সমাজ নারীকে সমীহ করে। টাকা-পয়সা থাকলেই পুরুষ শক্তিশালী আর নারীর শক্তি হলো সেই পুরুষ যার টাকা ও ক্ষমতা আছে, স্বামীর অর্থ থাকলে সমাজে নারী ধনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষূী, ‘স্বামীর হাতে ধন থাকলে/ স্ত্রীর নাম লক্ষী’। স্বামী নারীর বল শুধু নয় সাত রাজার ধন, ‘স্বামী আমার গুরুজন, এক রাজার নয়, সাত রাজার ধন’। সমাজে উচ্চবিত্ত কিংবা প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির স্ত্রীর হালচালে অভিজাত্য তবুও গ্রাহ্য কিন্তু নির্ধনের কন্যাকে সমাজে টিকে থাকতে হয় শারীরিক শ্রমে, ‘ধনীর বেটি ধনে মানায়,/ নির্ধনের বেটি গতরে মানায়’। আর কোনো কারণে যদি সে স্বামী পরিত্যক্ত কিংবা বিধবা হয় তবে সে জলে ভাসা পদ্ম।

নারীর সব কাজ সর্বদাই নিন্দনীয়। বায়ুত্যাগ মানুষের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ক্রিয়া। সেটা পুত্র করলে মহাভারতের দুর্ধর্ষ দুর্যোধনের শক্তির প্রকাশ আর নারীর বেলায় সেটা অমঙ্গলের, ‘পুত্র পাদেন দুর্যোধন, বউ পাদলেই অলক্ষণ’। আবার বয়সের ক্রমবিকাশে কন্যাসন্তানের স্তনের প্রকাশ ঘটলে জন্মদাত্রী মাও তাকে স্নেহের চোখে দেখে না; অথচ পুরুষের দাড়ি গজালে মার অন্তহীন অহংকারÑকারণ সেটা পৌরুষের চিহ্ন, ‘ঝি-এর ওঠে স্তন, মায় না পায় মন;/ পুতের ওঠে দাড়ি, ফিরে বাড়ি বাড়ি’। সমাজের মতো পিতা-মাতার কাছে পুত্র আর্শীবাদ, কন্যা বোঝা। সমাজ মনে করে কানা ছেলেও বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে দেখভাল করবে কিন্তু কন্যা যদি রাজবধূও হয় তবু সে মাতা-পিতাকেই চুষে খায়, ‘কানা পুতে পোষে, রাজার বউ শোষে’। পুরুষের দেওয়া চিন্তা ধারণ করে মায়েরা তথা নারীরাও মানসিকভাবে নারীবিদ্বেষী হয়ে ওঠে, শরীরে নারী হলেও তখন তারা মগজে পুরুষ।

পুরুষের জেদ তার অলংকার, তার সকল সৃষ্টির উৎস। আর নারীর ক্ষেত্রে সেই জেদই তার শত্রæ, জেদি মেয়ে মানেই খারাপ, পতিতা, ‘মরদের জিদে বাদশা, মাইয়ার জিদে বেশ্যা’। আবার নারী যদি স্বতন্ত্র চিন্তার অধিকারী হয় বা বুদ্ধিমতি হয় সেটাও নিতান্ত দোষের। নারীকে মেধাহীন রেখে পুরুষ তাদের উপর কর্তৃত্ব করতে চায়, তাই স্ত্রী বুদ্ধিসম্পন্না হলে সে পুরুষ না কি জীবন্মৃত, ‘যার নারী স্বতন্ত্রা সে জীয়ন্তে মরা’। আবার নারীর বুদ্ধিতে সংসারযাত্রা চালালে স্বামীর নিশ্চিত মরণ, ‘আবর তাঁতি গোবর খায়, স্ত্রী বাক্যে মরতে যায়’।

স্ত্রী প্রজ্ঞাবতী হলেও বিপদ, না হলেও দোষের। স্বামী যাই করুক তাতে তার বীরত্ব প্রকাশ পায় কিন্তু নারী প্রতিবাদী হলে সমাজের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, ‘মিনসের কোলে ছেলে দিয়ে, মাগী যায় লড়ায়ে ধেয়ে’। পুরুষ চায় স্ত্রী হবে অন্তঃপুরবাসিনী। জ্ঞান বা প্রজ্ঞা নয় লজ্জাই তার অলংকার, আবরণ-আভারণ, ‘স্ত্রীলোকের লজ্জাই ভুষণ’। নারী আচরণে কমনীয় আর সাংসারিক কাজে শক্তিশালী হবে, সেক্ষেত্রে তার শারীরিক দুর্বল্য একেবারেই কাম্য নয়, ‘মিড়মিড়ে প্রদীপ আর লিড়বিড়ে বউ’। বস্তুত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সৃষ্ট ‘লালসালু’র রহিমার মতো সহজ-সরল-পতিপরায়ণা-নিরুত্তর-শক্তিশালী-সুনিপুণ গৃহকর্মা নারীই পুরুষের পছন্দ; স্বাধীনচেতা, নির্ভীক জমিলাকে পুরুষ ভয় পায়।

কন্যাসন্তানের নিজস্ব কোনো গুণ নেই, তারা বাবা-মায়ের কোনো কাজে আসে না। তবে যোগ্যতম পাত্রের সঙ্গে যদি বিবাহ দেওয়া যায় তবে সুফল পাওয়া যায়, ‘দশ পুত্র সম কন্যা যদি সুপাত্রে পড়ে’। অর্থাৎ ভালো কাজে কন্যার কোনো কৃতিত্ব নেই। সমাজে প্রচলিত আছে ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে এই কথা দিয়ে নারীকে সংসারের সুখের কারণ হিসেবে দেখিয়ে অমঙ্গলের দায়ভারও চাপানো হয়েছে। সেখানেই শেষ নয়, প্রবাদের শেষাংশেই সত্য লুকানো রয়েছে। বস্তুত, সংসারে সুখ আনার ক্ষেত্রে নারী বা স্ত্রীর কোনো ভ‚মিকা নেই সেখানেও পুরুষই মুখ্য, ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে যদি পুণ্যবান স্বামী মিলে তার সনে’। সুতরাং রমণীর গুণে সংসার সুখের হয় না, সুখের মূল কারণ সেই পুরুষ।

সম্পর্কের উপর নির্ভর করে নারীর সামাজিক অবস্থান। মা, শাশুড়ি, বোন, পিসি, মাসি, ননদ, শ্যালিকার পারিবারিক, সামাজিক অবস্থান ও অধিকারে রকমফের হয়। এর পিছনেও রয়েছে সেই পিতৃতন্ত্র। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বাবাই পরিবারের কর্তা তাই সন্তানদের কাছে বাবার বোনের মর্যাদা মায়ের বোনের চেয়ে বেশি, ‘বাবার বোন পিসি ভাত কাপড়ে পুষি;/ মা’র বোন মাসি, কাদায় ফেলে ঠাসি’। সংসারে বোনের কদর থাকলেও বধূর বোনের কদর নেই, ‘নিজের বোন ভাত পায় না, শালির তরে মোÐা’। বধূ যেখানে পরের মেয়ে সেখানে তার বোনকে আপ্যায়ন করলে লোকসমাজ তো কুনজরে দেখবেই। নারী তা সে কন্যা, বধূ, চাচি, ভ্রাতৃবধূ, শাশুড়ি যে পরিচয়ের হোক তারা কখনো আপন হয় না। চাচা আপন কিন্তু চাচি ও তার গর্ভজাত কন্যা পর, ‘চাচা আপন, চাচি পর; চাচির মেয়ে বিয়ে কর’। অদ্ভুত সমাজচিন্তা! চাচা আপন কিন্তু তার ঔরসজাত কন্যাটি পর। নারীর না আছে বুদ্ধি, না আছে শুভচিন্তা, না আছে শারীরিক শক্তি সে কি না পুরুষের নিয়ন্তা। যার মুখের কথাই শুধু তার শক্তি সে কেমন করে স্বামীর চালক হতে পারে? অথচ, সমাজ মনে করে ভাইয়ের আদর, যতœ, ভালোবাসা স্ত্রীনির্ভর, ‘ভাইয়ের ভাত ভাজের হাত’। ভাই নিজেই সহোদর, সহোদরাকে সাহায্য না করলেও সব দোষ গিয়ে পড়ে অবলা নারীর উপর।

নারীর জন্য শাসন-শোষণ শুধু ধার্য, স্নেহ-মমতা দিলেও নাকি কন্যা নষ্ট হয়ে যায়। পিতৃগৃহে পিতা-মাতার স্নেহে নাকি কন্যাসন্তান নষ্ট হয়, ‘বাপের বাড়ি ঝি নষ্ট, পান্তা ভাতে ঘি নষ্ট’। সমাজ মতে, নারীকে শাসনে রাখতে হবে না হলে সে বিগড়ে যায়। তাই তার শাসনের যথাযথ জায়গা শ^শুরবাড়ি, ‘লোহা জব্দ কামারবাড়ি,/ মেয়ে জব্দ শ^শুরবাড়ি’। সমাজের চোখে জন্মদাত্রীর চেয়ে ধাত্রীও দামি কারণ সে বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করেছে। আর সন্তান জন্মদানে বধূ বাধ্য তাই তার আলাদা মর্যাদার কিছু নেই। সেজন্য ধাত্রী পায় নতুন শাড়ি আর জন্মদাত্রী বধূর জন্য তেনাই যথেষ্ট, ‘বউয়ের পরনে তেনা, ধাইয়ের পরনে শাড়ি’। এর একমাত্র কারণ সমাজের কাছে ঘরের বউ দাসী, পরের মেয়ে।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে দ্বিচারিতার অন্ত নেই। সেখানে মা এবং স্ত্রী একেবারে ভিন্নভাবে বিবেচিত হয় অথচ দুজনেই মেয়ে। বিয়ে সম্পর্কে দুজনের অবস্থান ভিন্ন হয়ে যায়। আজ যে বধূ সেই তো বছর কয়েক পরে বাড়ির গিন্নি তবুও বধূ হিসেবে নারী অপাঙ্ক্তেয়। সে পরের বাড়ির মেয়ে, দুজনেই কারো না কারো স্ত্রী। অথচ পরিবারে-সমাজে মা আর স্ত্রী অবস্থানে আকাশ-পাতাল তফাত। মা গৃহের কর্ত্রী, তিনি যদি বড়ো অপরাধ করেন তাও তা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না কিন্তু স্ত্রী যদি তার সিকি আনা ভুলও করে তবে তা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ, ‘বউ ভাঙলে সরা, গেল পাড়া পাড়া;/ গিন্নি ভাঙলে নাদা, ও কিছু নয় দাদা’। শুধু সম্পর্কেভেদে নারীর ভুল ভিন্নভাবে সমাজের কাছে ভিন্নভাবে বিবেচ্য, শাস্তিও আলাদা। পুরুষ যেভাবে নারীকে চাইবে সে ভাবে চরলে সে ভালো অন্যথা হলেই বিষধর সর্পী, ‘গৃহিণী ল²ীরূপিণী,/ বাম হলে কালভ‚জঙ্গিনী’।

নারীর গুণের চেয়ে তার শারীরিক বা বাহ্যিক সৌন্দর্য পুরুষের কাছে বেশি মূল্যবান। তাও আবার নির্ভর করে তার পিতৃক‚লের উপর। নারী রূপবতী হলেও লাভ নেই যদি উচ্চ বংশের না হয়। সেক্ষেত্রে সে ডোবার পানি, তা যত স্বচ্ছ হোক না কেন। তার থেকে নদীর ঘোলা পানি ভালো, ‘জাতের মেয়ে কালো ভালো, নদীর জল ঘোলাও ভালো’। নারী যত সুন্দর হোন না কেন তাতে কিছুই এসে যায় না যদি তার জাতকুল ঠিক না থাকে, ‘সুন্দরের মুখে ছাই,/ জাতি-কুলের ঠিক নাই’। অর্থাৎ নারীর সকল অবস্থান ঐ পিতৃকুল, স্বামীকুল বা পিতা ও স্বামীর শক্তিমত্তার উপর নির্ভরশীল।

নারীকে হতে হবে সুন্দরী, অল্প বয়স্ক। অথচ পুরুষের কোনো বয়স নেই বরং না, বরং পুরোনো চাল ভাতে বাড়ে। তাই তো শ্মশানযাত্রী পুরুষের সঙ্গে শিশুকন্যার বিয়ে সমাজের কাছে অত্যন্ত স্বাভাবিক। অন্যদিকে কনের বয়স কুড়ি পেরোলেই সে বুড়ি, ‘কুড়ি হইলেই বুড়ি’। সমাজের চোখে পুরুষের কোনো বয়স হয় না, সে সুন্দর না অসুন্দর এসব বিবেচ্য বিষয় না। আবার ছেলের বিয়েতে সমাজ-সামাজিকতা করতে গিয়ে টাকা-পয়সা খরচ হয় সেক্ষেত্রে যদি বধূ সুন্দরী না হয় তাতেও সমাজের আক্ষেপের অন্ত নেই, ‘সেই কড়ি ক্ষয়, তবু বউ সুন্দর নয়’। সে টাকা নববধূর জন্য খরচ করেনি বরং সমাজে নিজের নাম কিনতে খরচ করেছে তবুও দোষ নারীর।

সমাজের কাছে যে নারী অবলা, যার মুখেই শুধু শক্তি, যাকে পুরুষ আশ্রয় দিলে আশ্রয় পায়, খাবার পায়, যে অবিশ্বাসী তার জন্যই পুরুষ নষ্ট, পুত্র-কন্যা নষ্ট বিষয়টা বড়ো আশ্চর্যের বিষয় নয় কি? এই বিষয়ে ভ‚রিভ‚রি প্রবাদ-প্রবচন রয়েছে, ‘রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট,/ স্ত্রীর দোষে স্বামীর কষ্ট’। স্বামীর কষ্টের কারণ স্ত্রী আবার সন্তানের নষ্টের কারণও নারী, ‘মাতৃদোষে শিশু নষ্ট’। যে মা তার সর্বস্ব দিয়ে সন্তানের জন্মদানসহ তার লালন-পালন করেন সেই মাকেই সন্তানের নষ্টের কারণ মনে করে সমাজ। সমাজের কাজে নারী শিশু হিসেবে বা কন্যা হিসেবে দায় বা বোঝা তেমন বৃদ্ধা হিসেবেও বোঝা। বুড়ো বয়সে নারী-পুরুষ সবাই কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। একদিন যারা পরিবারের জন্য, সন্তানের জন্য সব বিলিয়ে দিয়েছিল তারা বয়োবৃদ্ধিতে সন্তানের উপর নির্ভরশীল হয়। সেক্ষেত্রেও বয়স্ক নারী পরিবারের বোঝা, পুরুষ নয়, ‘বাড়ির আপদ বুড়ি,/ পেটের আপদ মুড়ি’। সন্তানের কাছে বৃদ্ধ বাবা দামি হলেও মা কিন্তু আপদ, বোঝা। সুতরাং নারী কন্যা, স্ত্রী, বধূ, জননী কোনো অর্থেই আদরণীয় নয়।

প্রকৃতপক্ষে অভিজ্ঞতা নয় বরং নির্দিষ্ট সমাজের বা ভ‚খÐের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাচেতনা-জীবিকার উপায় আর সেখানকার ভ‚প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য প্রবাদ-প্রবচনে ব্যক্ত হয়। সুতরাং বলা যায় বাংলা প্রবাদের ভিত্তিমূলও বাঙালির সমাজমনস্কতা, বাংলার ভ‚প্রকৃতি, যাপিত জীবন ও জীবিকা। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় বাংলা প্রবাদে নারী যেভাবে রূপায়িত হয়েছে সেটা নারী সম্পর্কে সমাজচিন্তার বাস্তব প্রতিফলন।