গুজবে ঢাকা পড়ল দুই কিশোরীর মৃত্যুর সত্য, শোকে ভাঙা দুই পরিবার

ঢাকার যাত্রাবাড়ীর মেঘলা বিকেলটা ৭ নভেম্বর দু’টি পরিবারের জন্য পরিণত হয় জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার দিনে। শ্রমজীবী বাবা ফারুক গাজী ও মা লিপি বেগম ছয় মাস আগে সন্তানদের জন্য স্বপ্ন বুকে নিয়ে ওঠেন মৃধাপাড়ার মোল্লাবাড়ির দোতলা বাড়িতে। বাবা লোহার কারখানায় শ্রমিক, মা বাসার সামনে পিঠা বিক্রি করেন সবটুকু আশা ছিল সন্তানদের মানুষ করে তোলা।
কিন্তু এক মুহূর্তেই বদলে যায় সবকিছু। দোতলার ছাদের পাশে থাকা ১১ হাজার ভোল্টেজের খোলা তারে জড়িয়ে আগুনে পুড়ে প্রাণ হারায় ১৩ বছরের খাদিজা। একই ঘটনায় দগ্ধ হয় তার বান্ধবী মরিয়ম (১৩)। আগুনে পোড়া শরীর নিয়ে ১০ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে হার মানে সেও।
গুজবের আগুনে আরও পুড়ল দুই পরিবার
ঘটনার পর পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি ভিডিও। সেই ভিডিওতে বানানো ক্যাপশন “ছাদে টিকটক করতে গিয়ে দুই কিশোরীর মৃত্যু।”
মুহূর্তেই দাবানলের মতো ছড়ায় মিথ্যাটি। কমেন্টে ভরে ওঠে ঘৃণা, ব্যঙ্গ, অভিশাপ। অথচ সত্য হলো—ঘটনার সময় দু’জনের কাছেই মোবাইল ছিল না। খাদিজার নিজের ফোনটিও দুর্ঘটনার ভিড়ে হারিয়ে যায়। এই গুজব এতটাই ছড়ায় যে জানাজা ও শোকের সময়েও স্বজনরা এসে প্রশ্ন করে— “ওরা কি সত্যিই টিকটক করছিল?”
সেদিন বিকেলে আসলে যা ঘটেছিল
দোতলার ছাদের কোণে এক পানির ট্যাংকি। সেখানে কোনো অটো-স্টপ ব্যবস্থা নেই। ট্যাংকি ভরে গেলে পাইপ ঘুরিয়ে পানি বন্ধ করতে হয়। সেই পাইপ বন্ধ করার দায়িত্বেই ছাদে যায় খাদিজা ও মরিয়ম।
খাদিজা তখন গোসল করে এসেছে, লম্বা ভেজা চুল। ছাদের ধারে বসার সময় পাশের ভবনের উচ্চ ভোল্টেজ তারের এতটাই কাছে চলে যায় যে তার চুল তারের সঙ্গে আটকে যায়। মুহূর্তেই শরীর জ্বলে ওঠে আগুনে।
মরিয়ম তাকে উদ্ধার করতে গেলে সেও দগ্ধ হয়। নিচের মানুষজন ভয়, আতঙ্ক আর বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় কেউ এগিয়ে যেতে পারেনি।
অসহায় বাবা-মায়ের কান্না
খাদিজার মা লিপি বলেন,“গোসলের পর ফোন চাইছিল, আমি দেই নাই। একটু পর আইসা বলল, পানি পড়তাসে—বন্ধ করতে যাই। তার কিছুক্ষণ পর শুধু আগুনের শব্দ। দৌড়াইয়া দেখি, আমার মেয়ে ঝুলতেছে আর পুড়তেছে… আমি কিছুই করতে পারলাম না।”
খাদিজার বাবা ফারুক বলেন,“ফেসবুকে এত গুজব দিছে—বলি কি, আমার মেয়েটা টিকটক করতেছিল না। ফোনই ছিল না ওর কাছে। মিথ্যা কথা শুনে বুকটা ফেটে যায়।”
মরিয়মের বাবা আল-আমিন তখন ঘরে ছিলেন— “জানতামই না মেয়েটা ছাদে গেছে। পরে ডাকাডাকিতে বুঝি দু’জনই আগুনে পুড়ছে।”
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য
স্থানীয় দোকানদার কাদের কিবরিয়া বলেন,“মোবাইল তাদের হাতে ছিল না। তারা খেলাধুলা করছিল। মানুষ যা-তা কথা ছড়াচ্ছে।”
মরিয়ম মারা যাওয়ার আগে তার ফুফুকে জানিয়েছিল, খাদিজা ভুল করে ভেবেছিল তারে কস্টেপ প্যাঁচানো না থাকলে সেটা কারেন্টের তার নয়। এরপরই ঘটে দুর্ঘটনা।



