বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬
নারী

নারীকে পিছিয়ে রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়: শামা ওবায়েদ

content (7)

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতা, নীতি ও সাংগঠনিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তার মতে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারীকে রাজনৈতিক ও নেতৃত্বের জায়গা থেকে পিছিয়ে রেখে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বে তরুণ নারীদের ক্ষমতায়ন’ শীর্ষক সমাপনী সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। জার্মানভিত্তিক রাজনৈতিক ফাউন্ডেশন ফ্রেডরিখ এবার্ট স্টিফটুংয়ের (এফইএস) সহযোগিতায় এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

শামা ওবায়েদ বলেন, তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করার পাশাপাশি সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে। স্থানীয় পর্যায় থেকে নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি করা গেলে নারীরা ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবেন। এ জন্য শুধু নির্বাচনের সময় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলেই হবে না, রাজনৈতিক দলের নিয়মিত কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও তাদের জায়গা তৈরি করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে শিক্ষা বাড়লেও রাজনীতি ও সমাজে নারীদের সামনে এখনো নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। অনলাইন হয়রানি, সাইবার বুলিং, সামাজিক চাপসহ বিভিন্ন বাধার কারণে অনেক নারী রাজনীতিতে সক্রিয় হতে নিরুৎসাহিত হন। এসব সমস্যা মোকাবিলায় রাষ্ট্র ও সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

শামা ওবায়েদ বলেন, নারীদের রাজনৈতিকভাবে সহযোগিতা করা কোনো দয়া বা বিশেষ সুবিধার বিষয় হওয়া উচিত নয়; বরং এটি একটি নীতিগত অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। রাজনীতিতে নারীদের পথ সহজ নয়। নানা প্রতিকূলতা থাকলেও মেধা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মান নিয়ে তাদের এগিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সিজিএসের প্রেসিডেন্ট ও সংলাপের সঞ্চালক জিল্লুর রহমান বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মতের নারীরা একই প্ল্যাটফর্মে এসে কাজ করেছেন—এ আয়োজনের অন্যতম বড় অর্জন এটি। তবে প্রকৃত রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে শুধু নারীদের সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নারীদের কার্যকর ক্ষমতা দিতে হবে।

Advertisements

তিনি আরও বলেন, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীরা যেন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে পারেন, সে জন্য শুধু রাজনৈতিক দল নয়, সাধারণ মানুষের মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন। নারীর প্রতি প্রচলিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো না গেলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন হবে।

সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি ভোটের সুযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তার মতে, অর্থ ও পেশিশক্তিনির্ভর রাজনীতি নারীদের রাজনৈতিক অঙ্গনে এগিয়ে আসার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনীহা, দলীয় কাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং পরিবার ও সমাজে সম্পত্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করা জরুরি। এসব বৈষম্য রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণেও প্রভাব ফেলে।

এবি পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি বলেন, একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নারীদের নেতৃত্বের অবস্থান সেই দেশ ও সমাজের অগ্রগতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। রাজনৈতিক দলগুলোকে নারীদের জন্য বাস্তব ও কার্যকর সুযোগ তৈরি করতে হবে। তার মতে, নারী নেতৃত্ব শুধু সংখ্যার বিচারে বাড়লেই হবে না; নেতৃত্বকে হতে হবে গুণগত, কার্যকর ও অর্থবহ।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশের পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তার অভিযোগ, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারতন্ত্রের প্রভাব রয়েছে এবং নতুন প্রজন্মের নারী নেতৃত্বকে সামনে আনার ক্ষেত্রে অনীহা দেখা যায়। পাশাপাশি অনলাইনে নারীদের লক্ষ্য করে সাইবার বুলিং ও হয়রানি প্রতিরোধেও রাজনৈতিক দলগুলোর আরও সক্রিয় ও আন্তরিক ভূমিকা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য থাকলেও নারীদের শক্তিশালী করে তোলাই এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। তার মতে, নারীর অধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমান পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংলাপে বক্তারা বলেন, নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক দলের ভেতরে নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ, নিরাপদ পরিবেশ, অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক সহায়তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইন ও অফলাইনে হয়রানি বন্ধ এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের মাধ্যমে নারীদের জন্য রাজনীতিতে টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

Advertisements