বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬
স্বাস্থ্য

ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ? হতে পারে প্রাণঘা’তী স্লিপ অ্যাপনিয়া

cpap-101-treating-sleep-apnea-continuous-alt-1440×810

ঘুমের মধ্যে হঠাৎ শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, কিছুক্ষণ পর আবার শ্বাস নেওয়া—অনেকের ক্ষেত্রেই বিষয়টি অজান্তেই ঘটে। ঘুমের সময় বারবার এমন হলে শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে এবং মস্তিষ্ক সামান্য জাগিয়ে তুলে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। এতে গভীর ঘুম বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। এই অবস্থাকে বলা হয় স্লিপ অ্যাপনিয়া।

দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করালে এই ঘুমের সমস্যা শুধু দিনের ক্লান্তি নয়, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

স্লিপ অ্যাপনিয়া কী?
ঘুমের সময় বারবার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া বা শ্বাসের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়াকে স্লিপ অ্যাপনিয়া বলা হয়। এটি প্রধানত তিন ধরনের।

অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (OSA): সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এই ধরনের সমস্যা। ঘুমের সময় গলার পেশি শিথিল হয়ে শ্বাসনালি সরু বা বন্ধ হয়ে গেলে এটি হয়।

সেন্ট্রাল স্লিপ অ্যাপনিয়া (CSA): এ ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী পেশিগুলোকে প্রয়োজনীয় সংকেত পাঠাতে ব্যর্থ হয়।

মিক্সড বা কমপ্লেক্স স্লিপ অ্যাপনিয়া: অবস্ট্রাক্টিভ ও সেন্ট্রাল—দুই ধরনের সমস্যার বৈশিষ্ট্য এতে থাকতে পারে।

Advertisements

যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
স্লিপ অ্যাপনিয়ার অন্যতম পরিচিত লক্ষণ হলো জোরে নাক ডাকা। তবে নাক ডাকলেই যে স্লিপ অ্যাপনিয়া হয়েছে, তা নয়। ঘুমের মধ্যে বারবার জেগে ওঠা, শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া, দম বন্ধ লাগা বা হঠাৎ জোরে শ্বাস নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।

এ ছাড়া সকালে ঘুম থেকে উঠেও ক্লান্ত লাগা, মাথাব্যথা, দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব, মনোযোগ কমে যাওয়া, খিটখিটে মেজাজ, অস্থির ঘুম ও অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে যৌন সমস্যাও দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে আচরণগত পরিবর্তন, মনোযোগের সমস্যা বা অতিরিক্ত চঞ্চলতাও লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?
যে কারও স্লিপ অ্যাপনিয়া হতে পারে। তবে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা, পরিবারের কারও এই রোগের ইতিহাস, বড় টনসিল, বয়স বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ ও কিছু হৃদ্‌রোগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি হতে পারে। পুরুষদের মধ্যেও এর প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে মধ্যবয়স পর্যন্ত।

চিকিৎসা না করলে কী হতে পারে?
স্লিপ অ্যাপনিয়া দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোকসহ বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ঘুমের ব্যাঘাতের কারণে দিনের বেলা অতিরিক্ত তন্দ্রা দেখা দিলে গাড়ি চালানো বা ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ে।

তাই নিয়মিত নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা কিংবা দিনের বেলায় অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব থাকলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
চিকিৎসক প্রথমে রোগীর উপসর্গ, ঘুমের ধরন এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইতিহাস জানতে পারেন। প্রয়োজন হলে স্লিপ স্টাডি বা ঘুমের পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে পলিসমনোগ্রাম একটি প্রচলিত পরীক্ষা। এতে ঘুমের সময় শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদ্‌স্পন্দন, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা এবং মস্তিষ্কের কার্যকলাপসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হয়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়িতেও ঘুমের পরীক্ষা করা সম্ভব।

কতটা গুরুতর, তা বোঝা যায় কীভাবে?
স্লিপ অ্যাপনিয়ার তীব্রতা নির্ণয়ে অ্যাপনিয়া-হাইপোপনিয়া ইনডেক্স (AHI) ব্যবহার করা হয়। ঘুমের প্রতি ঘণ্টায় গড়ে কতবার শ্বাস বন্ধ হচ্ছে বা শ্বাসের প্রবাহ কমছে, তার ভিত্তিতে এটি নির্ধারণ করা হয়। সাধারণভাবে প্রতি ঘণ্টায় ৫–১৪টি ঘটনা হলে হালকা, ১৫–২৯টি হলে মাঝারি এবং ৩০টি বা তার বেশি হলে গুরুতর স্লিপ অ্যাপনিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

চিকিৎসা কী?
চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের ধরন ও তীব্রতার ওপর। অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার ক্ষেত্রে CPAP (Continuous Positive Airway Pressure) যন্ত্র সবচেয়ে প্রচলিত চিকিৎসাগুলোর একটি। এটি ঘুমের সময় শ্বাসনালি খোলা রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বায়ুচাপ সরবরাহ করে।

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে মুখে ব্যবহারের বিশেষ ডিভাইস, ঘুমের অবস্থান পরিবর্তন, ওজন নিয়ন্ত্রণ বা অন্যান্য চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অস্ত্রোপচার, বিশেষ ডিভাইস বা অন্য চিকিৎসাও বিবেচনা করা হয়।

ঝুঁকি কমাতে যা করবেন
স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শরীরচর্চা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা উপকারী। ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং অ্যালকোহল গ্রহণ না করাও কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া। CPAP বা অন্য কোনো যন্ত্র ব্যবহারে সমস্যা হলে নিজে থেকে বন্ধ না করে চিকিৎসককে জানানো উচিত।

স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ থাকলে ‘সাধারণ নাক ডাকা’ ভেবে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। সময়মতো রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা নিলে ঘুমের মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিও কমানো সম্ভব।

Advertisements