বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
পাঠক কর্নার

‘বাবার স্মৃতি’

‘বাবার স্মৃতি’

ডাকপিয়ন হোল্ডিং নাম্বার দিয়ে বাড়ি খোজার জন্য চিঠি দেখালে পুকুর পাড়ের লন্ড্রির রাজন কাকা বলে, এইটা তো মালেক ভাইয়ের মেয়ে। ওর মা এই সামনের মর্ডান স্কুলে চাকরি করে, মমতাজ ম্যাডাম। তখনো লন্ড্রির অপজিটের বাড়িটা করা হয়নি। দুইটা রুম ভাড়া দেয়া। আমরা থাকি ভাড়া। মর্ডান স্কুল থেকে কনফার্ম হয়ে আব্বুর স্কুলে (পুলিশ লাইন হাই স্কুল) গেলো। সেই পিয়নকে কি আপ্যায়ন! মেয়ের চাকরির নিয়োগ পত্র নিয়ে এসেছে। জনতা ব্যাংক এক্সিকিউটিভ অফিসার।

মর্নিং ওয়াকেও আব্বু আমাকে নিয়ে ভাবতেন। কুমিল্লা পার্কে মর্নিং ওয়াক করতে যেয়ে তখনের কুমিল্লা জোনাল হেড স্যারের সাথে পরিচয়। সেখানে গল্প করতেন। আমার মেয়ের আপনাদের ব্যাংকে রিটেনে হয়েছে। ভাইবা দিয়ে এসেছি। কবে ডাকতে পারে? দোয়া করবেন। ইত্যাদি। উত্তরা ব্যাংকে নিয়োগ পত্র পেলাম প্রবেশনারী (সিনিয়র) অফিসার।

ঢাকা এসে আমাকে নিয়ে জনতা ব্যাংকের হেড় অফিসে গেলেন একজন জিএম এর কাছে। আব্বুর পরিচিত। দুইটা এপোয়েন্টমেন্ট কার্ড নিয়ে। ওর জন্য কোনটাতে জয়েন করা ভালো হবে, পরামর্শ চেয়ে।

আমাকে নিয়ে এভাবে সারাদিন সারাক্ষণ ভাবার মানুষটি ছিলেন আব্বু।
বাবু আসছো বলে হাত বাড়াবার মানুষ।

আমি যখন ম্যাডিক্যাল এডমিশনে ব্যার্থ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো সাবজেক্ট পাচ্ছি না। তখন সিদ্ধান্ত নিলেন, প্রাইভেটে পড়াবেন। সাবজেক্ট ভালো না হলে, অনেকেই চাকরি পায় না। ২০০০ সালে বাড়ির দেড় লক্ষ টাকার জমি বিক্রি করে দিলেন। আমি কম্পিউটার বিজ্ঞানে ভর্তি হলাম। ইবাইস ইউনিভার্সিটি।

এমন গল্প ভীষণ কমন। আমার কাছে গল্প হচ্ছে, আমি ফ্যান ছাড়া ঘুমাতাম না। বিদ্যুৎ গেলেই জেগে কান্না। আব্বু কোলে নিয়ে রফিক মঞ্জিলের গলিতে হাটতেন। কোলে নিয়ে বাইরে হাটলে ঘুমাবে। কাধেই আমার ঘুম।

প্রায়ই সকালে সাথে নিয়ে পার্কে হাটতেন। করতেন ধর্মসাগড় আর আশে পাশের নজরুল একাডেমি, সার্কিট হাউজের ঐতিহ্যের গল্প।


নিয়ে যেতেন ন্যাপ এর অফিসে। ভিক্টোরিয়া কলেজের ইন্টার শাখার পাশে ছিলো অফিসটা। ততকালীন ন্যাপ এর প্রধান অদ্যাপক মুজাফফর আহমেদ স্যার, জাকির কাকা, হাসান মামা, হোসেন মামা সহ মিটিং এ আমি তাদের রং চা, বিস্কিট কতো যে খেয়েছি। খালি পায়ে শহীদ মিনারের পদযাত্রায় সামনে থাকতাম ফুলের তোড়া নিয়ে।

আমাকে সাথে নিয়ে রাতের ইংরেজি খবর দেখতেন, নারী সংবাদ পাঠিকাদের পেশা অনেক প্রেস্টিজিয়াস বুঝাতেন।

বাড়িতে চেয়ারম্যান জ্যাঠা সহ বড় বড় মিটিং এ আমিই হতাম একমাত্র নারী সদস্য। আব্বু আমাকে পাশে রাখতেন। জ্যাঠা বাধা দিতেন না। অথচ নোয়াখালী ঘেষা আমাদের বাইশগাঁও গ্রামে বোরখা নেকাব ছাড়া কোনো নারীই দেখা যেতো না।

আমাকে এখানে এনে, তিনি শান্ত হয়ে চিরনিদ্রায়। আমি ভীষণ অশান্ত। আমি এলোমেলো লিখছি। গুছিয়ে লিখতে অনেক স্থির হতে হয়।