আমি চাই অন্ধকার, রাত্রির অন্ধকার

রাত্রি ও ইশানের বন্ধুত্বের বয়স প্রায় দশ মাস।
যদিও এই দশ মাসের মধ্যে তাদের সরাসরি একদিনও দেখা হয়নি, তার কারন হলো ইশান থাকে আমেরিকার
শিকাগোতে আর রাত্রি বাংলাদেশে। তাই বেশিরভাগ সময় তাদের কথা হতো ফোনে আর মাঝে মাঝে ভিডিও
কলে।
বন্ধুতের সূচনাটা অবশ্যও ইশানের। রাত্রি প্রথম দিকে খুব একটা আগ্রহ দেখাইনি, কোন পুরুষ মানুষের
সাথে বন্ধুত্ব করার ইচ্ছে তার ছিল না।
রাত্রির বাবা আমিরুল ইসলাম সরকারী ব্যাংকের কর্মকর্তা, মা জোবাইদা বেগম একটি স্কুলে শিক্ষকতা
করে্ন। এক নজরে চোখে পরার মতো মেয়ে নাজিয়া ইসলাম রাত্রি, গায়ের রঙ কাঁচা হলুদের মতো, টানা টানা
চোখ, পাতলা ঠোঁট, চুল ঘন কালো পিঠ পর্যন্ত, লম্বা পাঁচ ফিট দুই ইঞ্চি। অর্থাৎ একটা মেয়ের যে কয়টি
বৈশিষ্ট্য থাকলে তাকে রূপবতী বলা যায়, রাত্রির মধ্যে তার সবকয়টি বিদ্যমান।
তাইতো মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও অনেক উচ্চবিত্ত পরিবার থেকে তার বিয়ের প্রস্তাব
আসতো। অবশেষে বিয়েও হয় এক বিশাল ধনি পরিবারের ছেলের সাথে। যদিও রাত্রির এই বিয়েতে খুব একটা
মত ছিল না, কিন্তু তার বাবা মা তাদের একমাত্র কন্যাকে খুব শখ করেই বিয়ে দেয় ধনী
পরিবারের ছেলের সাথে। এই বিশাল ধনী পরিবারের সাথে রাত্রি কিছুতেই মানিয়ে চলতে পারছিলো না, এক
বছর সে তার মনের সাথে অনেক যুদ্ধ করে, অবশেষে যখন জানতে পারে যে তার বরের বিভিন্ন চারিত্রিক
সমস্যা আছে তখন সে ফিরে আসে বাবা মায়ের কাছে।
ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংলিশে অনার্স মাস্টার্স করা রাত্রি, বর্তমানে একটা এনজিও তে
চাকরী করে। ভেবেছিলো বিয়ের চিন্তা আপাতত সে আর করবে না কিন্তু এক ইশান তার জীবনে এসে অনেক
কিছু আবারও ওলট পালট করে দিলো।
প্রথম প্রথম রাত্রি জিজ্ঞেস করতো, তুমি কেন আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাও, আমি তো তোমার থেকে
বয়সে বড়,
তুমি এমন কোন বড় না, মাত্র তিন বছরের বড়, তাছাড়া বন্ধুত্বের কোন বয়স নেই,
আমার একবার বিয়ে হয়েছিলো, সেটাও তো তুমি জানো,
সেটা আমাদের বন্ধুত্বের মধ্যে কোন বাঁধা হতে পারে কি?
আমি অপরিচিত মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করি না,
ঠিক আছে তাহলে আগে পরিচিত হই, তারপর না হয় বন্ধু হইলাম।
ইশান আহমেদ, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বর্তমানে একটি
সফটওয়্যার ডেভেলাপমেন্ট কোম্পানিতে কাজ করে। দেখতে বেশ ভাল, গায়ের রঙ ফর্সা, লম্বা পাঁচ ফিট নয়
ইঞ্চি, চেহারার মধ্যে একটা নায়ক নায়ক ভাব আছে।
ফেসবুকে রাত্রির প্রোফাইল দেখার পর থেকে তার সাথে পরিচিত হবার জন্য নাছোড়বান্দার মতো লেগে
থাকে, ইশানের একটাই কথা, “তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে, তোমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই। “
অবশেষে, রাত্রি একদিন তার সাথে ফোনে কথা বলতে রাজি হয়, মেসেঞ্জারেই কথা হয় তাদের প্রায় বিশ
মিনিটের মতো।
এরপর থেকে রাত্রি ও ইশানের নিয়মিত যোগাযোগ হতো। সপ্তাহে অন্তত তিন দিন ভিডিও কলেও কথা
বলতো তারা, ইশানের মজার মজার কথা, রাত্রির প্রতি তার যত্ন , ভালোবাসা, রাত্রির মনে এক ধরনের
ভাললাগা তৈরি করতে থাকে, এক ধরনের মায়ায় জড়িয়ে যেতে থাকে সে। একদিন ইশানের মেসেজ না পেলে
অস্থির হয়ে পরতো, মনের মধ্যে শংকা তৈরি হতো যে ইশানের কোন সমস্যা হয়নিতো? ভালো আছে তো
ছেলেটা?
সকালে ঘুম থেকে উঠে ইশানের শুভ সকাল আর ঘুমনোর আগে শুভ রাত্রি যেন তার নিত্যদিনের সাথী হয়ে
গিয়েছিলো।
হটাৎ একদিন ইশান বললো, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই রাত্রি।
রাত্রি একটু হকচকিয়ে গেলো। ইশানকে তার ভালো লাগে ঠিক কিন্তু বিয়ে ? তা কি করে হয় ? সে বললো,
তোমার সাথে আমার বিয়ে কি তোমার পরিবার মেনে নিবে ইশান?
আমার পরিবারকে মানিয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমার, আমি সামনের বছর জুন জুলাইয়ে দেশে আসবো, তখন
তোমাকে বিয়ে করতে চাই যদি তুমি রাজি থাকো,
না ইশান , এইটা কোনভাবেই সম্ভব নয়, আমি একজন ডিভোর্সি আবার তোমার থেকে বড়, এ হয় না ইশান,
ইউএসএ তে এইগুলো কোন বিষয়ই না, তুমি তৈরি হতে থাকো, আমরা বিয়ে করবো।
রাত্রি আর কিছু বলে না। ইশানের সাথে তার সম্পর্কটা ভালোবাসার কি না সে জানে না কিন্তু এই কথা তো
সে অস্বীকার করতে পারবে না যে ইশান তার একধরনের অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। খুব অল্প সময়ের পরিচয়
হলেও এক ধরনের আকর্ষণ তার ইশানের প্রতি তৈরি হয়েছে। তাই সে মানসিক ভাবে ইশানকে বিয়ে করার
জন্য তৈরি হতে লাগলো, ইশানকে নিয়ে এক আনন্দময় জীবনের স্বপ্ন দেখতে লাগলো।
এভাবেই কেটে গেল আরও দু মাস। কিন্তু কারও কারও জীবনে হয়তো সুখ কখনোই দীর্ঘমেয়াদী হয় না।
রাত্রি যখন ভাবতে লাগলো ইশানের বিষয়টি নিয়ে সে তার বাবা মায়ের সাথে কথা বলবে তখনই সে ইশানকে
আবিষ্কার করলো এক অন্য রূপে।
ইশান যেন সেই আগের ইশান আর নেই। হঠাৎই যেন থেমে গেল রাত্রির প্রতি তার পাগলামী। সে আর আগের
মতো রাত্রির সাথে যোগাযোগ করে না, রাত্রি মেসেজ দিলে সে দেখে না বা দেখলেও ঠিক মতো জবাব দেয় না
বা দিলেও অনেকদিন পর দেয়, রাত্রি ফোন দিলে বেশির ভাগ সময় ফোন কেটে দেয় অথবা বলে, "আমি
ব্যস্ত, এখন কথা বলতে পারবো না।"
রাত্রি কি করবে বুঝতে পারে না, তার খারাপ লাগে, ভীষণ খারাপ লাগে, কারও সাথে প্রতিদিনের একটি
অভ্যাস হয়ে গেলে , হঠাৎ সে অভ্যাস থেকে ফিরে আসা যে কতোটা কঠিন, মনের ওপর যে কি পরিমান
চাপের সৃষ্টি হয় তা যার জীবনে ঘটে সেই জানে।
রাত্রি একসময টের পেল যে ইশান তাকে উপেক্ষা করছে, কিন্তু যে মানুষটা তাকে এতোটা অনুভব করতো,
দেশে এসে তাকে বিয়ে করার স্বপ্নও দেখিয়েছিল সে কেন হঠাৎ দূরে সরে গেল রাত্রি তা কিছুতেই বুঝতে
পারলো না। তার কাছে মনে হলো তাহলে কি এইটা ইশানের এক ধরনের খেলা ছিল? মেয়েদের অনুভূতি নিয়ে
খেলে কি সে মজা নেয়? কিন্ত তা কি করে হয়, ইশানের এতো আবেগের কথা, রাত্রির প্রতি এতো অনুগত
সবই কি অভিনয় ছিল? না না এ হতে পারে না, তাকে যেমন করেই হোক ইশানের সাথে কথা বলতেই হবে।
তাই একদিন সে ইশানকে আবার ফোন দিল। একবার নয়, দুবার নয়, ছয়বার ফোন দেয়ার পর ইশান ফোন ধরে
বিরক্ত স্বরে বললো,
বারবার কেন ফোন দিচ্ছো তুমি?
তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই,
কি কথা, তাড়াতাড়ি বল,
তুমি আমার সাথে যোগাযোগ কর না কেন ইশান?
তোমাকে তো বলেছি আমি ব্যস্ত
না, মিথ্যে কথা , শুধু ব্যস্ততার জন্য মানুষ যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় তা আমি বিশ্বাস করি না,
দেখ রাত্রি , আমার না এইসব ফালতু কথা শোনার সময় নাই,
ইশান প্লিজ, একটু শোন।
ইশান কিছু বলে না, চুপ করে থাকে।
রাত্রি কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে, আমার খুব কষ্ট হয় ইশান, তুমি আমার সাথে আর আগের মতো যোগাযোগ
কর না , আমার প্রতি তোমার আর কোন আগ্রহ নেই, তাহলে কেন আমার জীবনে এসেছিলে, কেন আশা
দিয়েছিলে যে আমাকে বিয়ে করবে?
ইশান কোন জবাব দেয় না।
চুপ করে আছো কেন? জবাব দাও , কি হলো জবাব দাও , আমি প্রতিদিন সকালে তোমার মেসেজের অপেক্ষা
করি, আমি তোমাকে আর আগের মতো পাই না তা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না ইশান। আমাকে
এইভাবে কষ্ট কেন দিচ্ছ তুমি?
এরপর যা ঘটলো তার জন্য রাত্রি একদম প্রস্তুত ছিল না। ইশান কোন জবাব না দিয়ে লাইন কেটে দিলো
এবং ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ সব কিছু থেকে রাত্রিকে ব্লক করে দিলো।
হতবাক হয়ে যায় রাত্রি, মোবাইলের দিকে বেশ কিছুক্ষন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো তারপর ঝর ঝর
করে কেঁদে দিলো। খালি মনে হতে লাগলো, মানুষকে বিশ্বাস করাও কি একটা শাস্তি ? তার জীবনে একবার
ঘটে যাওয়া দূর্ঘটনা কি যথেষ্ট ছিল না , আবারও এতো বড় ধোঁকা ?
বেশ কিছুদিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল সে। কারও সাথে খুব একটা কথা বলতো না, কোন কাজে মন
লাগাতে পারতো না, ঠিক মতো খেতে পারতো না , শুধু মনে হতো কি যেন একটা নেই , কিসের যেন এক ধরনের
শুন্যতা যা কাউকে বলতে পারতো না, কষ্ট চেপে রাখা যে কতো বড় কষ্ট তা যার ঘটে সেই বলতে পারবে।
জীবন কারও জন্য থেমে থাকে না, রাত্রির জীবনও থেমে থাকেনি। ইশান নামের মানুষটি তার হৃদয়ে যে
ক্ষত চিহ্নের সৃষ্টি করেছে তা হৃদয়ের গভীরের এক কোনায় ফেলে রেখে দিয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে
ফিরে যায় রাত্রি।
একদিন রাত্রির মা ঘরে এসে বসেন তার পাশে, বেশ কোমল গলায় বলেন, একটা ভালো সম্বন্ধ এসেছে তোর,
ছেলে আমেরিকা থাকে, ইনজিনিয়ার, ছেলে দেখতেও নাকি বেশ ভালো, আগে একটা বিয়ে হয়েছিল তবে ছয়
মাসও টিকেনি।
চমকে ওঠে রাত্রি। বলে, আমি কি তোমাদের বোঝা হয়ে গেছি মা ?
এমন করে ভাবছিস কেন? মেয়ের বিয়ে দেয়া বাবা মায়ের ফরয,
একবার তো দিয়েছিলে , তোমাদের ফরয কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে ,
এটা কেমন কথা বলছিস? মানুষের জীবনে কি দ্বিতীয় বিয়ে হয় না ? তাছাড়া আমাদের বয়স হচ্ছে, কখন কার
কি হয়ে যায় বলা যায়, তারপর তুই কি একলা জীবন কাটাবি?
একলা জীবন কাটাবো কি না তাতো জানিনা মা , তবে আমার মনে হয় আমি খুব দূর ভাগ্যবতী, আমি আবারও
কষ্ট পাবো,
আরে নাহ, পাত্র নিজে নাকি তোকে বিয়ে করতে খুব আগ্রহী,
প্রথমবারও পাত্র নিজে খুব আগ্রহী ছিল, তাতে লাভ কি হয়েছে?
জোবাইদা বেগম একটু কঠিন স্বরে বললেন, লাভ লোকসান বুঝি না, কাল সন্ধ্যায় পাত্রপক্ষ তোর সাথে
দেখা করতে আসবে, তুই পাত্রের সাথে কথা বলবি, ভাল লাগলে বিয়ে করবি আর ভালো না লাগলে অন্য
কথা।
পাত্রপক্ষ এলো পরদিন রাত আটটার দিকে, খুব বেশি কেউ নয়, পাত্র নিজে আর তার সাথে দুজন মহিলা,
খুব সম্ভবত পাত্রের দুই খালা অথবা ফুপু, কারন দুজনের চেহারা একই রকম।
রাত্রি অবশ্য বেশ সুন্দর করেই সেজেছে, একটা হাল্কা গোলাপি রঙের হাফ সিল্ক শাড়ি পরেছে, চুলে খোঁপা
করেছে, খোঁপায় আবার বেলি ফুলের মালা পরেছে, চোখে হাল্কা কাজল ও হাল্কা লিপস্টিক দিয়েছে, কানে
গোলাপি পাথর বসানো ছোট দুল ও গলায় লকেট বসানো স্বর্ণের চেইন পরেছে। তবে কেন এতো সেজেছে সে
নিজেও জানে না।
বসার ঘরে ঢুকতেই ভয়ংকর ভাবে চমকে উঠলো রাত্রি, পাত্র হিসেবে যে বসে আছে সে রাত্রির অতি পরিচিত
ইশান আহমেদ।
ইশান, রাত্রির দিকে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে থাকার পর বললো,
আমি রাত্রির সাথে একলা কিছুক্ষণ কথা বলতে চাই।
দুজনকে বসানো হলো রাত্রির রুমে। ইশান হাসি মুখে বললো, তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে রাত্রি।
রাত্রির চোখে মুখে ক্রোধের চিহ্ন, সে কঠিন গলায় বললো, কেন এসেছো আমাকে বিয়ে করতে?
রাত্রির প্রশ্নে হকচকিয়ে যায় ইশান। কিভাবে শুরু করবে ঠিক বুঝতে পারে না, সামনের দেয়ালের দিকে বেশ
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তারপর বলতে শুরু করে-
তোমার সাথে কথা বলার মাঝখানেই একটা মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়, মেয়েটা বাঙালি, আমার অফিসে
নতুন জয়েন করে, নাম অরনী। অরনীর সাথে আমার বেশ সুন্দর এক বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, এক
সময় মেয়েটাকে ভালো লাগতে থাকে, আমি খুব ভালোই বুঝতে পারি যে আমি অরনীর প্রেমে পরে গেছি, তখন
তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ফেলি বলে আমি দ্বিধায় পরে যাই, অরনী যখন আমাকে প্রেম নিবেদন করে
তখন আমি তোমাকে ভুলে যেতে চেয়েছিলাম, তাই তোমার মেসেজ ফোন উপেক্ষা করেছি।
কিন্তু বিয়ের পর আমার সাথে তার একদম বনিবনা হতো না, সে তার কেরিয়ার তার জীবনকেই বেশি গুরুত্ব
দিতে চাইতো, আমাকে খুব একটা গ্রাহ্য করতো না, আর আমার অবচেতন মনে চলে আসতে তুমি, কেন যেন
আমি অরনীকে তোমার সাথে মিলিয়ে ফেলতে চাইতাম অথচ সে ছিল একদম তোমার উল্টো । আমাদের
সংসারে অশান্তি বাড়তেই লাগলো। ছয় মাসের মতো টিকেছিলো সংসার , তারপর ডিভোর্স।
রাত্রি কিছু বললো না চুপ করে শুনলো। ইশান আবার বলতে শুরু করলো,
শুধুমাত্র তোমাকে বিয়ে করার জন্য আমি দেশে এসেছি, আমি তোমার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে তোমার
অফিসের নাম ঠিকানা জোগাড় করেছি, তোমার অফিসে গিয়ে তোমার বাসার ঠিকানা জোগাড় করেছি, আমার
এক খালাকে দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি।
ইশান একটু থেমে বললো, তুমিও একা আমিও একা সুতরাং আমাকে বিয়ে করতে নিশচয় তোমার কোন
আপত্তি নেই?
এইবার রাত্রি জবাব দিলো, বললো –
একজন ধোঁকাবাজকে বিয়ে করার থেকে সারাজীবন একলা থাকা ভালো,
এইভাবে বললে রাত্রি, কষ্ট পেলাম
কিছুটা বিদ্রুপমার্কা হাসি দিয়ে বললো,
কষ্ট দেয়ার অধিকার কি শুধু ছেলেদের আছে ইশান, আমাদের নেই ?
ক্ষোভ এবং করুনা উভয় মিশ্রনের এক চাহনী দিল ইশান, তারপর বললো, কিন্তু তুমি তো আমাকে
ভালোবাসো ?
সাথে সাথে সে কঠিন স্বরে সরাসরি ইশানের চোখের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল,
কে বলেছে আমি তোমাকে ভালোবাসি? ভালোবাসতাম, যখন তুমি আমায় অবহেলা করতে তখন অনেক
ভালোবাসতাম, কিন্তু এখন আর তোমাকে ভালোবাসি না ইশান।
তারপর চোখ সরিয়ে নিয়ে মাথা নিচু করে বসে রইলো, তার চোখ ছলছল করছে, কষ্ট আর ক্রোধে তার
নিঃশ্বাস যেন ভারি হয়ে গেল। ইশান কিছু একটা বলতে হয়তো চেয়েছিলো কিন্ত সেই সুযোগ রাত্রি দিল না।
আবারও ইশানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলো তবে এইবার গলার স্বর ভারি,
“মেয়েদের মন ফুলের পাপড়ির মতো কোমল কিন্তু এই কোমল মনে যখন কেউ আঘাত দেয়, যখন কষ্ট জমতে
শুরু করে তখন তা হয়ে যেতে থাকে বরফের মতো শীতল, আর এই মন একবার শীতল হয়ে গেলে কঠিন রূপ
ধারন করে, তখন আর তাকে ফেরানো যায় না। “
ইশান কি বলবে ঠিক বুঝতে পারছে না। সে রাত্রিকে কষ্ট দিয়েছে এই কথা অস্বীকার করার উপায় তার নেই,
আসলেই তো সে রাত্রির কাছে অপরাধী, কিন্তু রাত্রির জন্যইতো সে এতো দূর ছুটে এসেছে, বিয়ে করার পর
তার অবচেতন মনে রাত্রিই ছিল এই কথাও তো সত্য। সে বুঝতে পারছে রাত্রিকে সে হারিয়ে ফেলেছে, তার
পাগল করা ভালোবাসাকে সে হারিয়ে ফেলেছে, তারই দোষে সে হারিয়ে ফেলেছে।
সে দুই হাত এক করে ক্ষমার ভঙিতে প্রশ্ন করলো, অর্থাৎ আমাকে তুমি বিয়ে করবে না?
রাত্রি স্পষ্ট ভাষায় বললো "না”।
এরপর দুই বছর কেটে গেলো। রাত্রি আগের মতোই আছে, পাঁচ দিন অফিস করে তার সময় ভালই কেটে যায়,
ছুটির দুদিন বাবাকে সময় দেয়। ছয় মাস আগে তার মা মারা যান, এখন শুধু বাবা মেয়ের সংসার।
এক অলস সন্ধ্যায় সে বসে আছে বারান্দায়, হঠাৎ মনে পরে যায় ইশানের স্মৃতি। ইশানের সাথে বিয়ে হলে
আজ নিশচয় তার জীবন অন্য রকম হতো। পর মুহূর্তেই সে ভুলে যেতে চায় ইশান নামক গল্পটা। সে বারান্দা
থেকে ঘরের দিকে যায়, তার পুরোনো খয়েরী ডায়েরীটা বের করে। এক সময় লেখালেখির হাত ভালো ছিল তার,
অনেকদিন পর আবার লিখতে শুরু করে-
"ফিকে হয়ে যাওয়া ভালবাসা হঠাৎ হঠাৎ উকি মারে স্মৃতির জানালায়,
জানালা খুলে দেখি নিভে যাওয়া সেই প্রদীপটি মিটমিট করে জলছে,
বলছে, আমাকে ফিরিয়ে দাও, আমি ফিরে পেতে চাই,
দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া ইচ্ছে গুলো চেয়ে থাকে অপলক,
গহীন ক্ষতস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে চায় একটি আর্তনাদ,
ধূসর আকাশ যেন শোনাতে চায় নীল আকাশের গল্প,
স্মৃতির জানালা বন্ধ করে দেই,
কারন আমি নীল আকাশ চাই না,


