বদলেছে ডেঙ্গুর ধরন, এবার ডিইএনভি-৩ এর আধিপত্য

বাংলাদেশে এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ডেঙ্গু ভাইরাসের ডেন-৩ সেরোটাইপ শনাক্ত হচ্ছে বেশি হচ্ছে। গত বছর সবচেয়ে বেশি পাওয়া গিয়েছিল ডিইএনভি-২। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এ তথ্য জানিয়েছে। গত দুই সপ্তাহে বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি বাড়ার কথাও জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সংক্রমণের ধরন পরিবর্তনের ফলে রোগীদের শারীরিক জটিলতা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে; বিশেষ করে যারা অতীতে ডেঙ্গুর অন্য কোনো ধরনে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্যমতে, চলতি বছর যেসব ডেঙ্গু নমুনার সেরোটাইপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তার মধ্যে ৯১.৫% ভেনভি-৩ পেয়েছে। আর বাকি ৮.৫% নমুনায় পাওয়া গেছে ডেনভি-২। এ বছর এখন পর্যন্ত অন্য কোনো সেরোটাইপ শনাক্ত হয়নি। সম্প্রতি ৭১টি নমুনায় আরটি-পিসিআর পরীক্ষার মাধ্যমে আইইডিসিআর এই সেরোটাইপ শনাক্তকরণ পরিচালনা করেছে।
অন্যদিকে, গত বছর সবচেয়ে বেশি পাওয়া গিয়েছিল ডিইএনভি-২, হার ছিল ৪৯.২%। এরপর ছিল ডিইএনভি-৩ (৩৫.৮%), ডিইএনভি-১ (৮.৮%) এবং ডিইএনভি-৪ (৬.৩%)। আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী আহমেদ জাকী এ তথ্য জানিয়েছেন।
ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ রয়েছে – ডিইএনভি-১, ডিইএনভি-২, ডিইএনভি-৩ ও ডিইএনভি-৪। প্রতিটি সেরোটাইপের আবার একাধিক জিনগত ধরন (জিনোটাইপ) আছে।
অধ্যাপক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, ‘শক সিনড্রোম মূলত পুনঃসংক্রমণের সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। অর্থাৎ আগে একবার ডেঙ্গু হওয়া ব্যক্তি পরে অন্য সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়ার কারণে জটিলতা বাড়তে পারে। শিশু, বয়স্ক ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে মশা নিয়ন্ত্রণ। মশার বিস্তার রোধ করা না গেলে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়তেই থাকবে। আক্রান্তের সংখ্যা যত বাড়বে, মৃত্যুর সংখ্যাও আনুপাতিক হারে বাড়বে। তাই সংক্রমণ কমানোই মৃত্যুহার কমানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ইনচার্জ ড. শাহনূর শারমিন জানান, এ বছর এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু কিছুটা বেশি দেখা যাচ্ছে। তার মতে, শুধু জ্বর নয়, ডেঙ্গুর কারণে হৃদপেশির প্রদাহ (মায়োকার্ডাইটিস), মস্তিষ্কের প্রদাহের (এনসেফালাইটিস) মতো জটিলতাও কিছু রোগীর মধ্যে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি অনেকের জ্বরও তুলনামূলক দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এছাড়া শক সিনড্রোমের রোগীও আসছে বলে জানান তিনি।
ড. শারমিন আরও বলেন, ‘এসব জটিলতা বাড়ার পেছনে ডেনভি-৩-এর আধিপত্য সরাসরি দায়ী কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ সাধারণ চিকিৎসাসেবার অংশ হিসেবে প্রত্যেক রোগীর সেরোটাইপ পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না।’
তবে তিনি জানান, ডেঙ্গুর সেরোটাইপ যা-ই হোক না কেন, প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতি বা প্রটোকল একই থাকে।
এই বিশেষজ্ঞ জানান, জ্বর শুরু হলেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করা উচিত। কারণ শুরুতেই রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ সহজ হয় এবং জটিলতা প্রতিরোধ করা যায়।
শারমিন আরও জানান, ডেঙ্গু রোগীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয় হলো বিশ্রাম, পর্যাপ্ত ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ তরল গ্রহণ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ। শুধু পানি নয়, ওরাল স্যালাইন বা ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ পানীয়ও খেতে হবে। জ্বর কমানোর জন্য প্রয়োজন হলে প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে, পাশাপাশি স্পঞ্জিং বা জলপট্টিও দেওয়া যেতে পারে।
তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘অনেকেই জ্বর কমে গেলে সুস্থ মনে করে স্বাভাবিক কাজে ফিরে যান। কিন্তু ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় জ্বর সেরে যাওয়ার পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা, যাকে ক্রিটিক্যাল বা লিকেজ ফেজ বলা হয়। এ সময় রক্তচাপ কমে যাওয়া, তীব্র পেটব্যথা, বুকে ব্যথা, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, অজ্ঞান হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে হবে।’
তার ভাষ্যমতে, ডেঙ্গুতে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যার দিকে নজর দিলেই হবে না। রক্তচাপ ও হেমাটোক্রিটের পরিবর্তন আরও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। কারণ প্লেটলেট কমে গেলেও অনেক রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন, কিন্তু রক্তচাপ কমে যাওয়া বা প্লাজমা লিকেজ প্রাণঘাতী জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত সোমবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে দুই জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে ৪২৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মাধ্যমে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৬ জনে এবং মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ১০৪ জনে।
তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত পরীক্ষা করাতে হবে এবং মশার বিস্তার রোধে ব্যক্তি ও সামাজিক পর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।



