দেশের নাম পরিবর্তন করল নাওরু, নতুন নাম ‘নাওয়েরো প্রজাতন্ত্র’

প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট দ্বীপরাষ্ট্র নাওরু আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের দেশের নাম পরিবর্তন করেছে। এখন থেকে আন্তর্জাতিকভাবে দেশটির নাম হবে ‘নাওয়েরো প্রজাতন্ত্র’। স্থানীয় ভাষার উচ্চারণ ও বানানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার।
নাওয়েরোর প্রেসিডেন্ট ডেভিড অ্যাডিয়াং জানিয়েছেন, শুধু দেশের নাম নয়, এর আন্তর্জাতিক পরিচিতিমূলক সংকেত বা কোডেও পরিবর্তন আনা হবে। এত দিন দেশটির নাগরিকদের ‘নাউরুয়ান’ বলা হলেও নতুন নাম অনুসারে এখন থেকে তাদের ‘নাওয়েরো’ নামে পরিচয় দেওয়া হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশটি তার ঐতিহ্যবাহী পরিচয়ে ফিরে যাচ্ছে। বিদেশিদের উচ্চারণের সুবিধার জন্য এত দিন আন্তর্জাতিকভাবে ‘নাউরু’ নামটি প্রচলিত ছিল। তবে স্থানীয় জনগণের কাছে দেশটির নাম দীর্ঘদিন ধরেই ‘নাওয়েরো’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশটির পার্লামেন্টে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন প্রেসিডেন্ট ডেভিড অ্যাডিয়াং। তিনি তখন বলেছিলেন, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের ঐতিহ্য, স্থানীয় ভাষা এবং জাতীয় পরিচয়কে আরও যথাযথভাবে সম্মান জানানো হবে।
পরবর্তীতে পার্লামেন্টে দুই দফা ভোটের মাধ্যমে প্রস্তাবটি অনুমোদন পায়। শুরুতে নাম পরিবর্তনের বিষয়ে গণভোট আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও দীর্ঘ আলোচনার পর সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, এ ধরনের গণভোটের প্রয়োজন নেই।
প্রেসিডেন্ট অ্যাডিয়াংয়ের মতে, নাওয়েরো নামটি দেশের মানুষের পরিচয় ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই এই পরিবর্তন শুধু নাম পরিবর্তন নয়, বরং জাতীয় গৌরব ও ঐতিহ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
ছোট দেশ, বড় ইতিহাস
নাওয়েরোতে বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার মানুষের বসবাস। জনসংখ্যার দিক থেকে এটি বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। এর চেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ হলো টুভালু ও ভ্যাটিকান সিটি।
দেশটির ইতিহাসও বেশ বৈচিত্র্যময়। একসময় নাওয়েরো জার্মানির উপনিবেশ ছিল। পরে এটি অস্ট্রেলিয়ার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে আসে। ১৯৬৮ সালে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে।
১৯৭০-এর দশকে ফসফেট খনির কারণে নাওয়েরো বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশগুলোর একটি হয়ে উঠেছিল। খনিজ সম্পদ থেকে বিপুল আয় করলেও পরবর্তীতে ফসফেট শিল্পের পতনের কারণে দেশটি ১৯৯০-এর দশকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে নাওয়েরো
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি নাওয়েরো। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটির ভূমি ও মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নাগরিকত্বের বিনিময়ে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে একটি তহবিল গঠন করে নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের ভাষ্য, নাওয়েরো নামটি কখনো হারিয়ে যায়নি। স্থানীয় জনগণের পরিচয়, জাতীয় প্রতীক এবং ভাষার মধ্যে এই নাম সব সময়ই বিদ্যমান ছিল। এমনকি দেশটির সংবিধানেও এই নামের স্বীকৃতি রয়েছে।
ঔপনিবেশিক পরিচয় থেকে ঐতিহ্যের পথে
নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে নাওয়েরো এখন সেই দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হলো, যারা ঔপনিবেশিক বা আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত নাম পরিবর্তন করে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী নামকে সামনে এনেছে।
এর আগে ২০১৮ সালে আফ্রিকার দেশ সোয়াজিল্যান্ড নিজেদের নাম পরিবর্তন করে এসওয়াতিনি রাখে। এরপর ২০২২ সালে তুরস্ক আন্তর্জাতিকভাবে নিজেদের নাম তুর্কিয়ে হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
নাম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নাওয়েরোর জাতীয় উড়োজাহাজ ও জাহাজের নামেও পরিবর্তন আনা হবে। ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে নতুন নামকে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে নাওয়েরো সরকার।
জাতিসংঘসহ অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সরকারি ওয়েবসাইটেও দেশটির নতুন নাম ‘নাওয়েরো’ হিসেবে উল্লেখ করা শুরু হয়েছে।
দেশটির সরকারের আশা, এই নাম পরিবর্তন শুধু আন্তর্জাতিক পরিচয়ে পরিবর্তন আনবে না, বরং নাওয়েরোর মানুষের মধ্যে জাতীয় গর্ব ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ তৈরি করবে।



