পাথুরে নগরে প্রকৃতির ছোঁয়ায়

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়।হুট করেই সিদ্ধান্ত হলো মাসকট যাবো। এর আগে অনেকবার প্রস্তুতি
নিয়েও নানা কারণে হয়ে উঠেনি। তাই এবার আবার সুযোগ আসায় লুফে নিতে দু’বার ভাবলাম না।যদিও
এবারও ছেলেকে ছাড়াই যেতে হয়েছে। সঙ্গী ছিল ছোট মেয়ে আর তাদের বাবা।
ওমানে এটা ছিল আমাদের প্রথম সফর।তাই যাওয়ার আগেই গুগল করে এর ট্যুরিস্ট স্পষ্টগুলো
সম্পর্কে একটু ধারণা নেই। হাতে গোণা দিনগুলোর সাথে সমন্বয় করে এ পাথুরে দেশটিকে explore
করাটাই ছিল মূল লক্ষ্য। নয়নাভিরাম এ মরু অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন আমাকে বার বার
হাতছানি দিয়ে ডাকছিল।
আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ পূর্বে কোণে অবস্হিত ছোট্ট একটি দেশ, ওমান। তেল সম্পদ ছাড়াও দেশটির
অর্থনীতির একটা বড় অংশ আসে পর্যটন শিল্প হতে।ওমানের প্রাণকেন্দ্র হলো ওমানের রাজধানী ও
গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী মাসকট।
আমরা ছিলাম রাজধানী মাস্কটের প্রধান ব্যবসায়িক এলাকা “রুই” তে।এ রুই শহরের যতটুকু দেখার
সৌভাগ্য আমার হয়েছে তার মধ্যে একটা বিষয় বেশ নজর কেড়েছে।আর তা হলো -কোথাও কোন সুউচ্চ
দালান বা অট্টালিকা চোখে পড়েনি।উচ্চতায় প্রায় প্রতিটি ভবনই একটি নির্দিষ্ট উচ্চতার। কৃত্রিমতা
বিবর্জিত এ নগরীর যে বিষয়টি পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করবে তা হলো এর সুউচ্চ পাহাড়,
আর সারি সারি খেজুর গাছ। এছাড়া পাহাড়ের মাঝখানের প্রশ্বস্ত রাস্তা সত্যিই মনোমুগ্ধকর। কোথাও
কোন জ্যাম নেই।।রাস্তার কোথাও নেই কোন অবৈধ গাড়ি পার্কিং। এ দেশের মানুষ কানুনুের ব্যাপারে
বড্ড সচেতন।মরুভূমি, সমুদ্র উপকূল আর পাহাড়ের অপার সৌন্দর্য পর্যটকদের কাছে এ ওমান
শহরটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে।পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এ নগরীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর
“ওয়াদি “।
পাহাড়ের মাঝখানের শুকনো উপত্যকা গুলোর নাম হলো “ওয়াদি”। এগুলো বর্ষা মৌসুমে পানিতে
ভরে উঠে।এ ওয়াদি গুলোর মধ্যে অন্যতম সুন্দর ওয়াদি হলো “ওয়াদি বানি খালিদ”। প্রাকৃতিক
সৌন্দর্যে ভরপুর নয়নাভিরাম এ ওয়াদি ওমানের ট্যুরিস্ট স্পষ্টগুলোর মধ্যে অন্যতম। এছাড়া প্রধান
সমুদ্র বন্দর মাত্রা কর্নিশের দিন ও রাতের সৌন্দর্য আপনাকে বিমোহিত করবে, মাত্রা ফোর্ট হতে
মাত্রা কর্নিশের সৌন্দর্য ছিল দেখার মতো।চারপাশে পাহাড়। আর মাঝখানে নীল সবুজ জলরাশির খেলা।
আমাদের প্রথম যাত্রা ছিল ওয়াদি বানি খালিদের উদ্দেশ্যে।মাসকটের রুই শহর থেকে প্রায় ২০৬
কিলোমিটার দূরত্বে ‘ইবরা’ নামক জায়গায় অবস্হিত এ ওয়াদি বানি খালিদ।ওমানের ট্যাুরিস্ট স্পটগুলো
কিন্তু একটি থেকে একটি বেশ খানিকটা দূরে।যার ফলে জ্যাম বিহীন এ শহরেও আমাদের এক একটি
স্পটে পৌঁছাতে প্রায় দুই থেকে তিন ঘন্টার অধিক সময় লেগে যায়।তবে এখানে দূরে কোথাও গেলে
লোকাল ড্রাইভার চুজ করাই উত্তম।গুগল ম্যাপ ভরসা হলেও,জায়গা সঠিকভাবে না চিনলে স্পটগুলোতে
পৌঁছাতে বেগ পেতে হতে পারে।এর মধ্যে সবচেয়ে বিরক্তিকর মনে হবে এদেশের মানুষের ভাষাজ্ঞান।
নিজের দেশের ভাষা ছাড়া বেশিরভাগই অন্যভাষা তেমন বুঝে না।যেহেতু এখানে ভারতের কেরালা,গুজরাট
আর আন্দ্রা প্রদেশের লোকজনের একটা বড় রকমের আধিক্য রয়েছে,তাই কিছুটা হিন্দি ভাষা বুঝলেও
ইংরেজি ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। তাই অনেকের প্রথম প্রথম communication এ কিছুটা সমস্যা হতে
পারে।এছাড়া এখানে মানুষের সংখ্যা যেমন কম, ঠিক তেমনি রাস্তার পাশে খাবারের দোকানও তেমন
নেই।তাই খাবার সাথে নিয়ে যাওয়াটা উত্তম।আমরা বিষয়টা বুঝতে পারিনি বলে কিছুটা কষ্ট পেয়েছি।
ওয়াদি বানি খালিদে আমরা যখন পৌঁছাই তখন দুপুর তিনটা।গাড়ি পার্কিং করে আরো প্রায় ২০/২৫
মিনিট হাঁটতে হলো।এখানে আমরা প্রায় দেড় ঘন্টার মতো সময় কাটাই। অসম্ভব সুন্দর একটি
জায়গা।ওয়াদির সবুজ জলরাশি,পাথুরে পাহাড়, আর খেজুর গাছের সারি আপনাকে বার বার বিধাতার অপার
সৃষ্টির প্রতি কৃতজ্ঞ করবে।
ওয়াদি থেকে ফিরে পরদিন আমরা বের হই মাত্রা ফোর্ট আর আল শিফাহ সী বিচের উদ্দেশ্য।মাত্রা ফোর্টের সুউচ্চ ভবন হতে মাত্রা কর্নিশের সৌন্দর্য উপভোগ করে আমরা দুপুর নাগাদ পৌঁছাই আল শিফাহ বীচে। বেশ নিরিবিলি একটা সৈকত।আরব সাগরের নীল জলরাশি আপনার চোখের প্রশান্তি এনে দিবে এটা
সুনিশ্চিত।আর নিরিবিলি হওয়ার কারণেই নাকি ট্যুরিস্টরা একান্ত সময় কাটাতে, এ বীচকেই বেছে
নেয়।মরুভূমির বালুকাময় এ বীচ থেকে ফেরার সময় সুলতানের পুরনো বাসভবনটি দেখার একটু সাধ
হলো।বিশাল এলাকা জুড়ে এ বাসভবনের অবস্থান।রাশি রাশি ফুলের সমারোহে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল।
আমাদের হাতে সময় কম থাকায় একটু তাড়াহুড়ো করেই আমরা স্পটগুলো ভিজিট করি।কিন্তু যতটুকু
দেখেছি আলহামদুলিল্লাহ!!সারাদিনের জার্নির ক্লান্তি, অর্থ, সময়, সবকিছুকেই তুচ্ছ মনে হলো
প্রকৃতির এ অপার সৌন্দর্যের কাছে।


