বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬
রূপ-সৌন্দর্য

কাজলের নানা রূপ ও ব্যবহারের কলাকৌশল

IMG_6785

রূপটান যতই সামান্য হোক, কাজলের কালো ছোঁয়ায় চোখের মায়ায় যেন জাদু বুনে ফেলা যায়। সিনেমার পর্দা হোক বা বাস্তব জীবনের সুন্দর মুহূর্ত, কাজলনয়নের আবেদন অন্যরকমই। চোখের সাজ যে শুধুমাত্র সৌন্দর্যের অংশ তা নয়, এটি নারীর ব্যক্তিত্বের একটি শক্তিশালী প্রকাশ, যা যুগ যুগ ধরে সমাজে এক অম্লান ছাপ রেখেছে।

পুরানো দিনের শুধু কালো কাজল নয়, আধুনিক যুগে চোখের সাজেও এসেছে রঙের নানা ছোঁয়া। ডার্ক স্মোকি থেকে শুরু করে গ্রাফিক ডিজাইন, ক্যাট আই, উইঙ্গড, স্টোন ও সিকুইনের মতো জাঁকজমকপূর্ণ আই মেকআপের ছন্দে এখন কাজল যেন আরও বর্ণিল ও বৈচিত্র্যময় হয়ে উঠেছে। তবুও কাজলের কালো আকর্ষণ অদ্ভুত এক জাদুর মতো যা কখনোই হারায় না তার মৌলিক আবেদন।

কাজলের ব্যবহার প্রায় ৬,০০০ বছরের পুরোনো। প্রাচীন মিশরে নারী-পুরুষ উভয়েই চোখে কাজল লাগাতেন। তখন এর নাম ছিল “কোহল” । এর মূল উদ্দেশ্য ছিল চোখকে সূর্যের ঝলকানি থেকে রক্ষা করা এবং ধুলো-বালি থেকে বাঁচানো। মিশরীয় রাণী ক্লিওপেট্রার লম্বা কালো আইলাইনারের সাজ আজও কিংবদন্তি।

ভারতীয় উপমহাদেশেও কাজলের প্রাচীন ইতিহাস আছে আয়ুর্বেদ মতে, শিশুদের চোখকে ধুলো, ধোঁয়া, ব্যাকটেরিয়া থেকে বাঁচাতে মায়ের হাতের তৈরি কাজল লাগানো হতো। পরে এটি হয়ে ওঠে নারীর সৌন্দর্যের অন্যতম অলঙ্কার।

কাজল কেনার সময় কি কখনো ভেবেছেন, এরও নানা প্রকারভেদ রয়েছে? শুধু পেন্সিল বা কৌটো কাজল নয়, আজকাল বাজারে পাওয়া যায় নানা ধরনের কাজল, যার প্রতিটির আলাদা ব্যবহার ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাই যখন চোখের জন্য কাজল বেছে নেবেন, তখন বুঝে-বুঝে নির্বাচন করাই শ্রেয়। কারণ, প্রতিটি চোখের ধরন ও সাজ অনুযায়ী কাজলের ধরন এবং ব্যবহার পদ্ধতি আলাদা হওয়ায়, উপযুক্ত কাজল বাছাই করা না হলে সেই পরিপূর্ণ সৌন্দর্য প্রকাশ পায় না।

রিট্র্যাক্টেবল পেন্সিল কাজল (টুইস্টার)

রিট্র্যাক্টেবল পেন্সিল কাজল, যা সাধারণত “টুইস্টার” নামেই পরিচিত, আজকের দিনে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ব্যবহারবান্ধব কাজলের মধ্যে একটি। এটি ব্যবহার করা খুবই সহজ—কেবল একটি টুইস্ট করে কাজলের মুখ বের করে চোখে প্রয়োগ করা যায়, আর কোনো ধারালো করার প্রয়োজন হয় না। এই কাজল বিশেষভাবে তৈরি যাতে চোখে দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয় এবং সহজেই ঘেঁটে বা লেগে না যায়। অধিকাংশ টুইস্টার কাজল ওয়াটারপ্রুফ এবং স্মাজপ্রুফ হয়, অর্থাৎ ঘাম বা বৃষ্টিতে জলের মতো লেগে ছড়িয়ে পড়ার ভয় থাকে না। তাই যারা খুব ঘামেন বা বর্ষার দিনের মেকআপ নিয়ে চিন্তায় থাকেন, তাদের জন্য এই কাজল আদর্শ এক পছন্দ। দ্রুত এবং পরিষ্কারভাবে চোখ সাজাতে চাইলে এই রিট্র্যাক্টেবল পেন্সিল কাজলই সবচেয়ে সুবিধাজনক। এর মসৃণ টেক্সচার চোখে খুব নরম ভাবে লেগে যায়, যা চোখের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে।

পেন্সিল কাজল

পেন্সিল কাজল হলো চোখের মেকআপের ঐতিহ্যবাহী একটি জনপ্রিয় ধরন, যা সাধারণত কাঠের বা প্লাস্টিকের কাঠামোয় তৈরি হয়। ব্যবহার করার আগে এর সুচ বা কাজলের মাথাটা একটি তীক্ষ্ণ করার যন্ত্রের মাধ্যমে সূক্ষ্ম করে নিতে হয়, যাতে সহজেই চোখে স্পষ্ট ও নিখুঁত রেখা টানা যায়। রিট্র্যাক্টেবল বা টুইস্টার কাজল বাজারে আসার আগে এই পেন্সিল কাজলই ছিল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত। সার্বিকভাবে, পেন্সিল কাজল হলো একটি বহুমুখী এবং ব্যবহার বান্ধব মেকআপ উপকরণ, যা চোখের সাজে নরম, সুষম ও প্রাকৃতিক লুক দিতে পারে। 

কৌটো কাজল

ষাটের দশকে বিশ্ব জুড়ে সাইরেন আই মেকআপ জনপ্রিয় হয়েছিল, যা এখন নতুন করে ফিরে এসেছে। বলিউডে হেলেন, শর্মিলা ঠাকুর প্রমুখ শিল্পীকে চোখের এমন মেকআপ করতে দেখা গিয়েছে। তখন হয়তো এই নামে মেকআপটি পরিচিত ছিল না। এমন কাজল হাত দিয়ে বা স্পঞ্জ দিয়ে পরা হয়। ইচ্ছে মতো চোখের টান সূক্ষ্ম বা গাঢ় করা যায়। চোখের সামনের কোণে ক্যাটস আইয়ের মতো কাজল টেনে মাঝের আংশটা ছেড়ে, চোখের বাইরের কোণ মিলিয়ে দেওয়া হয় বলে ছোট চোখও উজ্জ্বল ও মোহময় দেখতে লাগে।

জেল কাজল

জেল কাজল হলো এমন এক ধরনের কাজল যা সাধারণত টিউব বা ছোট কন্টেইনারে পাওয়া যায়। এটি চোখের জন্য অনেকটাই পেইন্ট বা ক্রিমের মতো, যা ব্রাশ ব্যবহার করে লাগানো হয়। জেল কাজল ব্যবহার করলে চোখের মেকআপ অনেক সময় ধরে স্থায়ী থাকে এবং সহজে ঘেঁটে বা ছড়িয়ে পড়ে না। তাই এটি বিশেষ করে দীর্ঘ সময়ের জন্য চোখের সাজ বজায় রাখতে ইচ্ছুকদের জন্য আদর্শ। জেল কাজল লাগানোর আগে অবশ্যই চোখের পাতা পরিষ্কার ও তেল-মুক্ত করতে হবে, যাতে কাজল ভালোভাবে বসে এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়। এরপর মেকআপের প্রাইমার ব্যবহার করলে কাজল আরও সুন্দরভাবে লাগবে এবং দীর্ঘ সময় টিকে থাকবে।

কাজল চোখের সাজের প্রাণ। তবে ঠিকভাবে না লাগালে চোখের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে না। তাই কাজল টানার কিছু সহজ নিয়ম জানা জরুরি:

১) কাজল লাগানোর সময় হাত কাঁপানো এড়াতে টেবিলের ওপর কনুই ভর দিয়ে হাত স্থির রাখুন।

২) যে চোখে কাজল লাগাবেন, সেটি হালকা করে টেনে ধরুন যাতে পাতা সোজা হয়।

৩) একটানা টানবেন না, ছোট ছোট ধাপে চোখের বাইরের কোণা থেকে শুরু করে কাজল লাগান। এতে রং গাঢ় হয়।

৪) ছোট চোখের ক্ষেত্রে ভিতরের কোণে কাজল লাগানো ভালো নয়, এতে চোখ ছোট দেখায়।৫) চোখের মাঝখান থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত লম্বা টান দিন, এতে চোখের আকৃতি লম্বাটে এবং সুন্দর দেখায়।