নরক যাত্রা

রিহানের আম্মু আমাদের ক্লাস নিচ্ছে। রেস্টুরেন্টে খাওয়ার এটিকেট বিষয়ক ক্লাস। ছাত্র মাত্র দুজন, আমি আর আমার পুত্র রিহান।
প্রতিবার রেস্টুরেন্টে খেতে যাবার আগে এই বিশেষ ক্লাস নেওয়া হয়।
রিহানের আম্মুর ধারনা আমি ঘাস লতাপাতা খেয়ে বড় হয়েছি। সুতরাং মানুষ্য প্রজাতির খাদ্য গ্রহণের বিশেষ নিয়মনীতি আমার জানা নাই।
আমাদের আদবকেতায় গুরুতর ত্রুটি বিচ্যূতির কারণে প্রায়ই রিহানের আম্মুর লজ্জায় মাথা কাটা যায়। তাঁর মহামূল্যবান মাথা ইতঃপূর্বে বহুবার কাটা পড়েছে। আজ আর কাটা পড়ার চান্স নাই। সবকিছু ভালভাবে আয়ত্ত করে নিয়েছি।
প্রথমত আমার যে ভুলটা বেশি হয় তাহলো ওয়েটারকে “মামা” ডেকে ফেলি। এটা করা যাবে না “এক্সকিউজ মি” বলে প্রথমে এ্যাটেনশন সিক করতে হবে তারপর অত্যন্ত নম্রতার সাথে ফুড অর্ডার করতে হবে।
রিহানও আমার মতো এটিকেট সমস্যায় জর্জরিত। তাঁর মেইন সমস্যা হচ্ছে সে পাশের টেবিলে এতিমের মতো তাকিয়ে থাকে। একবার পাশের টেবিলে অসহায় ভাব নিয়ে তাকিয়ে চিকেন টিক্কা পেয়েছিল। আজ এ ব্যাপারে তাকে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে। কোনো প্রকার ছোটলোকি বরদাস্ত করা হবে না।
স্পুন, ফর্ক, নাইফ ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান দেওয়া হয়েছে। যদিও কোনটা কোন হাতে ধরতে হবে আমি ইতিমধ্যে ভুলে গেছি। ফুডের ব্যাপারেও রিহানের আম্মু ব্রিফিং দিয়ে রেখেছে।
অভিজাত রেস্টুরেন্টে দুইভাবে খাওয়া যায়। ব্যুফে এবং অ্যালাকাত ম্যানু। আমরা খাবো অ্যালাকাত ম্যানু। অর্থাৎ আমরা আমাদের পছন্দের ফুড অর্ডার করে নিবো।
এই অ্যালাকাত ম্যানু আবার তিন-চার ভাগে বিভক্ত যেমন, প্রথমে থাকবে স্টার্টার। স্টার্টার মানে হালকা নাস্তা জাতীয় খাবার পেটে ক্ষিদার উদ্রেক করে। স্টার্টারের ১০-১৫ মিনিট পর আসবে মেইন ডিস। তারপর একে একে ড্রিংকস, ডেজার্ট, চা- কফি এটসেট্রা। সবকিছু ভালভাবে রপ্ত করে নিয়েছি। এবার আর ভুল হওয়ার কোন সুযোগ নাই।
অতঃপর রেস্টুরেন্টে,
সুন্দর নীরিবিলি পরিবেশ। হালকা মিউজিকের সাথে নরম আলোর খেলা। এ এক অসাধারণ অনুভূতি। ঢুকার সাথে সাথেই সুন্দরী রিসেপশনিস্ট মিষ্টি হেসে অভ্যর্থনা জানালো। খাওয়ার পর যে আকাশ ছোয়া বিল আসবে তার অর্ধেক এখানে উসুল।
আমরা চার সিটের একটি টেবিলে বসলাম। মধ্য বয়সী গোঁফওয়ালা এক ওয়েটার ম্যানু নিয়ে এসেছে। শালার বেটা লোক সুবিধার না।তার যাবতীয় কর্মতৎপরতা রিহানের আম্মুকে কেন্দ্র করে আমার দিকে তাকাচ্ছেই না। তার মতিগতি মোটেও সুবিধার না।
আমি আস্তে করে উঠে গিয়ে রিসিপশনে বলে আসছি আমাদের টেবিলে যেন একজন লেডি সার্ভার দেয়া হয়।
রিহান কিডস জোনে চলে গেছে। তাকে নিয়ে দুঃচিন্তা হচ্ছে। গতবার এক সাবেক মন্ত্রীর নাতনিকে থাপ্পড় মারছিল। এবার না জানি কাকে কী করে!
রিহানের আম্মুকে অনেক সুন্দর লাগছে। রেস্টুরেন্টের অনেকেই তাকে আঁড় চোখে দেখছে। সে বিষয়টা দারুন উপভোগ করছে।
আমি কারো দিকে তাকালেই যতো দোষ আর সে রূপের রানী ক্লিওপেট্রা সেজে এসেছে। তাকে আর্জেন্ট রাগাতে হবে। রাগিয়ে তাঁর বিখ্যাত কালনাগিনী লুকটা সবার নজরে আনতে হবে। অন্তরে বিষ নিয়ে বাহিরে মাদার তেরেসা ভাব ধরেছে। দেখলে মনে হয় বিশ্বমানবতার শান্তিদূত আসলে একটা যুদ্ধবাজ মহিলা। যে নিজের স্বামী পুত্রকেও ছেড়ে কথা বলে না।
ঘনঘন রেস্টুরেন্টে খেয়ে আমার টাকার বারোটা বাজাচ্ছে। আজ একটা শিক্ষা না দিয়ে ছাড়বো না!
রিহানের আম্মু বললো
– চলো, পাস্তা জাতীয় কিছু খাই?
– এইসব ফিতাকৃমি তুমি খাও আমি খাব না!
ওয়াটারের সামনে ফিতাকৃমি বলায় রিহানের আম্মু বিব্রতবোধ করছে। যদিও অনেক কষ্টে নিজেকে কন্ট্রোল করেছে, তবে রাগের চাপ রয়েই গেছে। আরো রাগাতে হবে তাঁর ফেক মিষ্টি ভাবটা কমিয়ে শূণ্যের কোটায় নিয়ে আসবো।
আমি নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,
– স্যরি, আসলে পাস্তা খেলে আমার বমি বমি লাগে অন্য কিছু অর্ডার করো প্লিজ।
এবার আর সে নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। তাঁর মধ্যে মার্গারেট থ্যাচার ভাব ফুটে উঠেছে। কঠিন চোখে তাকাচ্ছে আমার দিকে !
ওয়েটার বললো,
– ড্রিংকস কী দেব স্যার ?
আমি বললাম,
– রেড ওয়াইন হলে ভালো হয়!
– স্যরি স্যার, আমাদের এখানে হার্ড ড্রিংকস এ্যালাও না। সফট ড্রিংকস যেমন পেপসি, কোক, মাউনটেন ডিউ হবে।
রেড ওয়াইনের কথা শুনে রিহানের আম্মুর চোখ থেকে আগুন ঝড়ছে ! চায়না মুভির শতমুখী সাপের মতো ফনা তুলেছে!
অসুবিধা নাই আমি সর্বাঙ্গে এন্টি ভেনম পুশ করে এসেছি। শুধু রিহানকে সাবধানে রাখতে হবে বেচারার পাবলিক ফাংশনে মাইর খাওয়ার দুঃসহ ইতিহাস আছে।
ইতঃমধ্যে রিহান কাজের কাজ করে ফেরছে। এক নায়িকার মেয়ের সাথে ফ্রেন্ডশিপ করে ফেলছে। মেয়েটাকে ঘন ঘন হাগ দিচ্ছে! বাসায় যে তিফা নামের একটি মেয়ে গভীর মমতা নিয়ে অপেক্ষা করছে তা সে ভুলে গেছে।
আমি রিহানের মাকে বললাম,
– দেখো তোমার বদমাইস ছেলে নতুন বন্ধবী জুটিয়েছে।কানের নিচে একটা দিয়ে তিফার কথা মনে করিয়ে দিবো নাকি !
– বাপ যেমন ছেলে তেমনই হইছে!
– কেনো, আমি কী কাউকে হাগ করেছি ?
রিহানের আম্মু রাগে ফোঁস ফোঁস করছে। কথা বাড়ালে নির্ঘাত ছোবল মারবে।
রিহানকে আনতে গেছিলাম সে আসেনি। নায়িকার মেয়ের সাথে বসে আছে উঠবে বলে মনে হচ্ছে না!
প্রচন্ড রাগে রিহানের আম্মুর খাবারে অরুচি দেখা দিয়েছে। রাগের মাথায় জিভ কাজ করার কথা না! সুতরাং খাবার পার্সেল করতে বলা হয়েছে।
চা কফি খাব কিনা ওয়েটার জানতে চাইছে। আমি বলেছি,
– গুড়ের চা কী হবে? হলে এক কাপ দেন!
“গুড়ের চা” শব্দটা শুনে রিহানের আম্মু সুনামির মতো ফোঁসে উঠে বলে,
– তোর সাথে যদি আর কোন দিন রেস্টুরেন্টে আসি তাহলে আমি অমানুষ !
মনে মনে বলি, “আমি তো সেটাই চাই!”
রিহানের আম্মু রাগ করে আমাদের রেখে চলে যাচ্ছে। আমি তাকে বিনয়ের সাথে বললাম,
– আরে যাচ্ছো কোথায়?
– নরকে যাচ্ছি!
বউ একা একা নরকে চলে যাচ্ছে। আমি রিহানকে ডেকে বললাম,
– বেটা তাড়াতাড়ি আয় তোর মা আমাদের রেখে নরকে চলে যাচ্ছে!
অতঃপর
আমরাও তাঁর পিছুপিছু নরকের দিকে রওয়ানা হলাম!


